বা ঙা ল না মা

বাঙালত্ব বাঙালীত্ব নিয়ে কয়েক ছত্র প্রলাপ

Posted by bangalnama on July 6, 2009


আমি বাঙাল এই রহস্যটা অনেকদিন জানতুম না। বাঙাল আবার কী? আমরা হলুম গিয়ে বাঙ্গালী। তাহলে এই যে মাইতি সার, চক্রবর্তী সাররা আছে, এরাও তো শুনি বাঙ্গালী? হ, বাঙ্গালীই তো। কিন্তু ত্যানারা হইলেন গিয়া কইলকাতার মানুষ। আসলে ত্যানাদের বাড়ি মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া। সহজ বাঙ্গালীদের কাছে অন্য-বাঙ্গালী মানেই কইলকাতার।

বাঙাল ভাষাই বা কী বস্তু? আমরা কই ঢাকাইয়া। সিলেটি, ময়মনসিঙ্গা বুঝতেও বিশেষ বেগ পাই না। এই সব ভাষাই বাংলা ভাষা। অবশ্য বাংলা না এরম ভাষাও আছে। ধরুন অসমিয়া, যে ভাষায় রাস্তাঘাটে কথা বলা ভাল। আর আছে হিন্দী, যে ভাষায় অমিতাভ বচ্চন ডায়লগ মারে। সে ভারি বদখৎ ভাষা, স্রেফ অমিতাভের গুণে অমৃতসমান। আর হল গিয়ে আপনার ইংরিজি, সাহেবরা বলে। এর মইধ্যে দ্যাখেন বাঙাল পাওয়া গেল না। তাইলে ক্যালকেসিয়ানটা কী? ভট্টাচার্যসাররা বাড়িতে ক্যালকেসিয়ান কয়। আহা বড় মনোরম লাগে শুনতে। রসাশ্রিত রসগোল্লা মুখে দিয়ে ফেললুম এমন একটা ভাব আছে। হেইটা কি আমাগো ভাষা নাকি? বুজ়লা না! হেইটা হইল গিয়া দেশি কুত্তার মুখে বিলাতি ডাক। আমাগো ঢাকাইয়া ফ্যালাইয়া থুইয়া কইলকাতার ফুটানি মারতাসে। ডাঁইপিপড়ায় পুটকিতে কামড়াইলে কী ভাষায় চিক্কুর পাড়বো দেখুম’অনে।

অবশ্য নিজের ভাষা নিয়ে বড়াই সকল বাঙ্গালীদের মধ্যে সহজলভ্য নয়। পুজোর ছুটিতে কলকাতা যেতুম। লোকাল ট্রেন, বাসের মধ্যে পিতৃদেব উচ্চৈঃস্বরে জানান দিতেন, এই জ়ানলা দিয়া দ্যাখ হাওড়া ব্রিজ়। বুইচছস বাপন এইটার নাম আছিলো হ্যারিসন রোড। আর আমরা দাঁত কিড়মিড় করতুম। গেঁয়োপনা এইভাবে জাহির না করলেই কি নয়! অবশ্য কে জানে চারপাশের কলকাতার লোকগুলো কিছু বুঝছে না হয়ত। ভাবছে সোয়াহিলি বা পুস্তুতে কথা বলছি আমরা।

পরে দিল্লীপ্রবাসী এক মাসীমার সাথে কথা বলে দেখেছি বাঙাল ভাষার হীনতা সম্পর্কে তিনিও নিশ্চিত। আমাদের প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা ঢাকাইয়া জানে না, কারণ বাড়িতে কলকাত্তাইয়া বলা হয়। কেন বলা হয়? হে অবোধ বালক, কলকাত্তাইয়া হল গিয়ে সংস্কৃতির ভাষা, শালীনতা, সভ্যতার প্রতীক। এই বক্তব্য সম্ভবত ওনার একার নয়, অনেকেই তাই মনে করেন। আমাগো দ্যাশে সেই দেশি কুত্তার প্রবাদটি চালু হওয়ার যৌক্তিকতা বেশ বুঝলুম।

বাঙাল যে আলাদা, জ়ারে কয় ‘the other’, এই ধারণার ইতিহাস পুরনো। হুতোমের নকশাতে বাঙাল দেশের জমিদারদের আহাম্মুকির বর্ণনা পাওয়া যাবে। ‘মাহেশের গঙ্গাযাত্রা’-এ:

“গঙ্গারও আজ চূড়ান্ত বাহার; বোট, বজরা, পিনেস ও কলের জাহাজ গিজ্‌গিজ্‌ কচ্চে, সকলগুলি থেকেই মাতলামো রঙ, হাসি ও ইয়ারকির গর্‌রা উঠ্‌ছে, কোনটিতে খ্যামটা নাচ হচ্চে, গুটি ত্রিশ মোসাহেব মদে ও নেশায় ভোঁ হয়ে রং কচ্চেন, মধ্যে ঢাকাই জালার মত পেল্লাদে পুতুলের মত ও তেলের কুপোর মত শরীর, দাঁতে মিশি, হাতে ইষ্টিকবচ, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, তাতে ছোট ছোট ঢোলের মত গুটি দশ মাদুলি ও কোমরে গোট, ফিন্‌ফিনে ধুতি পরা ও পৈতের গোচ্চা গলায় — মৈমনসিং ও ঢাকা অঞ্চলের জমিদার সরকারী দাদা ও পাতান কাকাদের সঙ্গে খোকা সেজে ন্যাকামি কচ্চেন; ষাট পেরিয়েচে, অথচ ‘রাম’কে ‘আম’ ও ‘দাদা’ ও ‘কাকা’কে ‘দাঁদা’ ‘কাঁকা’ বলেন –এঁরাই কেউ কেউ রঙ্গপুর অঞ্চলের ‘বিদ্যোৎসাহী’ কব্‌লান, কিন্তু চক্র করে তান্ত্রিক মতে মদ খান ও ব্যালা অবধি পূজো করেন। অনেকে জন্মাবচ্ছিন্নে সূর্য্যোদয় দেখেচেন কি না সন্দেহ!”

অবশ্যি, তীক্ষ্ণদ্রষ্টা হুতোমের আঁচড় থেকে নিচু তলার বাঙালও অচ্ছুৎ থাকেনি। এখানেও বাঙাল বহিরাগতঃ কখনো ক্রেতা, কখনো বিক্রেতা। ‘দুর্গোৎসব’-এ:

“বাঙ্গাল ও পাড়াগেঁয়ে চাক্‌রেরা আরসি, ঘুন্‌সি, গিল্‌টির গহনা ও বিলিতি মুক্তো একচেটেয় কিনচেন…

এদিকে জহুরী জড়ওয়া গহনার পুটুলি ও ঢাকাই মহাজন ঢাকাই শাড়ীর গাঁট নিয়ে বসেচে,…

এদিকে সন্ধ্যার সঙ্গে দর্শকের ভিড় বাড়তে লাগলো; বাঙ্গাল দোকানদার, ঘুস্কী, খানকীরা ক্ষুদে ক্ষুদে ছেলে ও আদ্‌বইসী ছোঁড়া সঙ্গে খাতায় খাতায় প্রতিমে দেখতে আসতে লাগ্‌লো।”

কলকাতা তখন শুধু বাংলার নয়, লন্ডনের পর বৃটিশ সাম্রাজ্যের বৃহত্তম শহর। নবাবী ঢাকার দিন গিয়াছে। আর্থিক অবক্ষয়ের মুখে রুজিরোজগার মাটি হওয়ায় ঢাকার জনসংখ্যা পর্যন্ত কমে আসছে। এহেন কলকাতার বিদ্বৎসমাজের মতামতের একটা ওজন আছে বই কি! বাঙালকে ‘অন্য’ করে দেখার কলকাত্তাই প্রবণতা কি আখেরে পূর্ববঙ্গীয়দের — অন্তত তাদের মধ্যে আলোকপ্রাপ্তদের — বুঝিয়েছিল কলকাতা যাহা ফতোয়া দেয় তাহাই বঙ্গ সংস্কৃতি? তার অনুকরণ ও নৈকট্যই ‘বাঙালেপনা’ থেকে নিষ্কৃতি এনে দেবে? কেননা ক’দিন আগে টের পেলুম অতি চিত্তাকর্ষক ইতিহাস বিদ্যমান।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন বিবিধ গরল ও অমৃত মন্থন করে তুলেছিল। বাঙালীত্ব তো বটেই, বাঙালত্ব প্রশ্নটিকেও আলোয় টেনে আনে খানিক। কার্জনসাহেবের প্রস্তাব ছিল পূর্ববঙ্গকে পশ্চিম থেকে আলাদা করে আসামের (এখনকার উত্তরপূর্বাঞ্চল) সাথে জুড়ে আলাদা রাজ্য তৈরির। স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব ও পশ্চিমের পারস্পরিক মিল-অমিলের প্রশ্নগুলো আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ময়মনসিংহের আন্দোলনকারীরা স্মারকলিপিতে জানাচ্ছেন কলকাতার ভাষাই প্রকৃত বাংলা। তার সংস্পর্শে এসে পূর্ববংগীয়রা শিক্ষিত হয়ে উঠছে। ভেন্ন করে দিলে ফের জংলী বাঙালে ফিরতে হবে।

সব সামাজিক প্রবণতার মত এই মনোভাবের বিপরীত দিক ছিল অবশ্য। মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন যে খুব সাড়া জাগাতে পারে নি আমরা জানি।

ভাষাগত একাত্মতা চিরশাশ্বত, অমোঘ নয়। কোন ভাষা, সংস্কৃতি আদর্শ তা নিয়েও ঐকমত্য থাকে না অনেক সময়। এই প্রসঙ্গে সিলেটের বৃত্তান্ত প্রণিধানযোগ্য। সিলেট বাংলার উত্তর-পূর্বের সীমান্ত। উত্তর দিকে মেঘালয়, পূর্ব দিকে কাছাড়ের পাহাড় শুরু হয়েছে। ১০ শতকের আগে কামরূপ রাজত্বের অধীনে ছিল অঞ্চলটি, নাম ছিল খন্ড কামরূপ। ১৩ শতকে আফগানদের বঙ্গবিজয়ের পর হিন্দুরা বড় সংখ্যায় দুর্গম সিলেটে পালিয়ে আসেন। বৃটিশদের মঞ্চে পদার্পণের পর ১৮৭৪ সালে সিলেটকে কেটে আলাদা করে আসামের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। নাহলে নাকি জনবিরল আসাম প্রদেশ আর্থিকভাবে স্বনির্ভর থাকছে না।

সে যাই হোক। বাংলায় পুনঃ অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সিলেটের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে অতঃপর মতপার্থক্য দেখা গেল। হিন্দুরা ফিরতে চান, মুসলমানেরা চান না। একে কিন্তু স্রেফ রাজনৈতিক ক্ষমতার আতশ কাচ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সিলেট আসামে থাকলে সিলেটের মুসলমানেরা আসামের মুসলমানদের সাথে মিলে ক্ষমতা হাতে রাখতে পারছেন। বাংলাতেও মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, অতএব ক্ষমতা তাঁদের হাতেই থাকছে। তা সত্ত্বেও সিলেটের মুসলমানদের বাংলায় অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপত্তি। পরে ১৯৪৭-এ দেশভাগের সময় কিন্তু দুই সম্প্রদায়ের মত উলটে গেল। সিলেটের হিন্দুরা হিন্দুপ্রধান ভারতে (আসামে) থাকতে চাইছেন, মুসলমানেরা পূর্ব-পাকিস্তানে ফিরতে চাইছেন। অতএব জুলাই মাসে রেফারেন্ডাম হয়ে সিলেটের একটি ছোট অংশ ভারতে এল, বাকি পাকিস্তান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সিলেট ছাড়া আর শুধু উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে পাবলিকের রায় জানতে চাওয়া হয়েছিল — তারা পাকিস্তানে থাকতে চান না হিন্দুস্থানে। বাকিটুকু র‌্যাডক্লিফ সাহেবের কাটাছেঁড়া।


সূত্রাবলীঃ

অনিন্দিতা দাশগুপ্তঃ ‘Remembering Sylhet: A Forgotten Story of India’s 1947 Partition,’ Economic and Political Weekly, August 2, 2008. (PDF)
কালীপ্রসন্ন সিংহঃ হুতোম প্যাঁচার নকশা ও অন্যান্য সমাজচিত্র, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ১৪০৪।
ডেভিড লাডেনঃ
Investing in Nature around Sylhet: An Excursion into Geographical History,’ Economic and Political Weekly, November 29, 2003. (PDF)
বোধিসত্ত্ব করঃ ‘বাঙালির জাতিবিদ্বেষ ১৯০৫: গৌরব না লজ্জা?’ আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০ অক্টোবর, ২০০৫। (Link)


লিখেছেন – দেবর্ষি দাস

About these ads

4 Responses to “বাঙালত্ব বাঙালীত্ব নিয়ে কয়েক ছত্র প্রলাপ”

  1. akash said

    ভালো লাগলো । বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যে কলকাতার ভাষাকে মান্যতা দেওয়া নিয়ে নানা রেফারেন্স পাওয়া শক্ত নয় । বিশেষতঃ বিবেকানন্দের লেখা-টার কথা উল্লেখ করা যেত । শহরের ভাষার আধিপত্য শুধু ভাষার আধিপত্য নয়, চিন্তারও আধিপত্য । লালগড়-নন্দীগ্রামের সময়ে কথাগুলো মনে রাখা প্রয়োজন ।

  2. zero2inf said

    zero2inf…

    [...]বাঙালত্ব বাঙালীত্ব নিয়ে কয়েক ছত্র প্রলাপ « বা ঙা ল না মা[...]…

  3. Chiranjib said

    মজার কথা হলো আমার চেনা বাঙালদের ৯০% বলেন তাদের অপার বাংলাতে বিশাল জমিজমা, সম্পত্তি ছিল; কারোর কারোর নিশ্চয়ই থাকতে পারে কিন্তু যখন একঘর লোকের প্রত্যেকে “আমার ঠাকুরদার মস্ত জমিদারী ছিল” বলে তখন আমার মন্টি পাইথন-এর সেই three yorkshiremen স্কেচের কথা মনে পড়ে.

    যাকগে,আমি নিজে ঘটি,তাই আপনাদের বেশির ভাগ রান্নার প্রসাদ এখনও পাইনি. (সেজন্যই কি পাকস্থলী এখনো ঠিক আছে? একবার আমার এক বাঙাল বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে কেলেংকারী, আমাদের বাড়িতে অত ঝাল দিয়ে রান্না হয় না ,যেটুকু হয় কাচালংকা দিয়ে আর আমি ওখানে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে কিলোখানেক মাংস খেয়েছি অন্তত দু কিলো শুকনো লংকাসহ;বাপরে ঐরকম পেটের যন্ত্রনা আর কোনদিন করেনি;শুধু এটুকু বলব পরের দিন সামনে কোনো বাঙ্গালকে দেখলে রক্তারক্তি হত.)

  4. shohini said

    chhotobelay mama barite thaktam. sekhane mama-mashi-didar kotha shune shune bangal bhashay shochhondo hoye uthechhilam. akdin amar maa office theke phire sunte pelen ami pukur pare dariye machh dhora dekhchhi ar mamader sathe bangal bhashay kotha bolchhi. kichhudiner moddhei amay convent school e porte pathiye deoa holo. onek boro hoye lokkho korechhi je maa-r khurtuto-pisturo bhai-bonra purbo bongiyo bhashate kotha bolleo maa kokhonoi seisob alochonay ongshogrohon korten na.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 62 other followers

%d bloggers like this: