বা ঙা ল না মা

তেভাগার আয়নায় কমিউনিস্ট পার্টি

Posted by bangalnama on June 1, 2010


– লিখেছেন দেবর্ষি দাস


চল্লিশের মত দশক বাংলাদেশে বড় কম এসেছে। শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দিয়ে, শেষ দেশভাগে। মাঝখানে ১৯৪২-এর সাইক্লোন, ভারত ছাড়ো আন্দোলন, জাপানী বিমানের বোমাবর্ষণ, মণ্বন্তর, ’৪৫-’৪৬ সালে একের পর এক গণবিক্ষোভ, পুলিশের সাথে খন্ডযুদ্ধ[1], শ্রমিক আন্দোলন ও ধর্মঘট[2], কলকাতা দাঙ্গা, নোয়াখালি, স্বাধীনতা। এর মধ্যেই কোথাও আছে তেভাগা। সে সময়ের কমিউনিস্ট কর্মীদের কারো কারো মতে দেশভাগকে আটকানোর ক্ষমতা তেভাগারই ছিল। কষ্টকল্পনা মনে হতে পারে। দেশভাগ তো সমস্ত উপমহাদেশের নিরিখে হয়েছিল। বাংলার বড়জোর বছরখানেক স্থায়ী একটি আন্দোলনের কাছে তাকে আটকানোর জোর হয়তো ছিল না। তবু উঁকি মেরে দেখা যেতে পারে তেভাগার পটভূমি ও ফলশ্রুতি। তেভাগা আলেখ্যে ঝাঁটা ও লাল ঝান্ডা সম্বল নন্দীগ্রামের নারীবাহিনীর শাঁখ-কাঁসি বাজিয়ে পুলিশ, জোতদারের লেঠেলদের মোকাবিলার কিস্যা পড়ি যখন, ইতিহাস নামে যে ভদ্রলোক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে ক্ষমা করতে চাইছিলেন না তাঁর অট্টহাসির রেশ কানে বেশ কিছুক্ষণ লেগে থাকে। বাংলার অন্যান্য কৃষক প্রতিরোধের মত তেভাগাও বেঁচে আছে কৃষক সম্প্রদায়ের সুপ্ত, যৌথ অবচেতনে। অবিভক্ত কমিউনিস্ট দলের বিশ্বাসঘাতকতাও যেন জন্মগ্রহণ করে চলেছে নব্য দলের নেমকহারামির মধ্যে।


কমলকুমার লিখেছিলেন বাবু জানিবেন তীর ছুটিবার আগে পিছু হটে। তেভাগার তীরকে বোঝার জন্য তার আগে যাওয়া প্রয়োজন। এক কথায় তেভাগা হল ভাগচাষিদের দাবির আন্দোলন। ভাগচাষি কারা? জমির মালিক অনেক সময় নিজে চাষ না করে জমি অন্য কোনো চাষিকে ভাড়া দেন। চাষির সাথে চুক্তি থাকে জমির ফসলের একটি অংশ মালিক ভাড়া হিসেবে পাবেন। ‘অংশ’ বা ‘ভাগ’ থেকেই ভাগচাষ ও ভাগচাষি। বাংলায় এর আরেকটা নাম বর্গা ও বর্গাদার। দেখা যায় ফসলের ভাগ সাধারণতঃ অর্ধেক ধার্য হয়। অর্ধেক মানে আধা। যে জন্য ভাগচাষের আরেকটি প্রচলিত নাম ‘আধি’। বর্গাদার আধিয়ার। জমির ভাড়া ফসলের ভগ্নাংশ না হয়ে একটি স্থির পরিমাণের অর্থমূল্যও হতে পারে। যেরকম বাড়িভাড়া হয়ে থাকে।


কিন্তু বাড়িভাড়ার সাথে ভাগচাষের পার্থক্য আছে। বর্গার ক্ষেত্রে ফসলের উৎপাদন হচ্ছে। বর্গাদার সাধারনত দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক। ভাড়া করা জমিতে শ্রম খাটিয়ে যা ফসল উঠছে তাই তার সম্বল। ওইটুকু যদি অনিশ্চিত হয়ে যায় (ধরুন যদি পরের বছর মালিক বর্গাদারকে উচ্ছেদ করতে পারেন) বা তার ভাগ যদি কম অংশের হয় তাহলে পেটে টান পড়ে। উল্লেখযোগ্য হল ১৭৯৩ সালে বাংলায় জমিদারি প্রথা প্রবর্তনের পর থেকে সাধারণ চাষি, যে আসলে চাষটা করছে, ন্যূনতম খেতে পরতে পারছে কিনা তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা দেখা যায়নি। সাধারণ চাষিদের একটা অংশ রায়ত যারা জমিদারকে অর্থমূল্যে খাজনা দিচ্ছে। ভাগচাষিদের অবস্থা রায়তদের থেকে করুণ। তারা অনেক সময় রায়তদের জমিতে বর্গা খাটছে। ভাগচাষিদের ভাগ বাড়ানো বা সে জমিতে ভবিষ্যতে চাষ করতে পারবে সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য কারও বিশেষ মাথাব্যথা দেখা যায়নি।


এর কারণ আবিষ্কার করা দুরূহ নয়। জমিদারি ব্যবস্থা জমি মালিকানার এক জটিল বাস্তু রচনা করেছিল। যে জমিদার ইংরেজ সরকারের থেকে তালুক ইজারা নিয়েছে সে চাষির থেকে খাজনা আদায়ের ঝামেলা থেকে বাঁচতে চাইছে। তাছাড়া কৃষিকাজ বেশ ঝুঁকির প্রকল্প। যদি বানে মাঠঘাট ভাসে ফসল উঠবে না, খাজনা অনিশ্চিত হয়ে যাবে। ফলে জমিদার তালুকের কয়েক টুকরো করে এক স্থির, নিশ্চিত আয়ের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে একদল নব্য ধনীদের দিয়ে দিলেন। এই দ্বিতীয় স্তরের লোকেদের অধিকার থাকল চাষির থেকে খাজনা তোলার। কিন্তু তারাই বা ফালতু বোঝা কাঁধে তুলবে কেন? তারাও স্থির আয়ের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে খাজনা তোলার অধিকার তৃতীয় স্তরের মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের বিক্রী করে দিল। এইভাবে স্তরের পর স্তর জমির মালিকানা তৈরি হয়। জমির কাগজের বেচাকেনায় ঊনিশ শতকের কলকেতা সরগরম। লক্ষ্য করুন কোনো এক স্তরের জমির কাগজের মালিকের পক্ষে কিন্তু জমির উৎপাদিকা শক্তি বাড়ানোর জন্য খুব আগ্রহ থাকার কথা নয়। যদি জমিতে খরচাপাতি করে চাষবাসের উন্নতি হয় তার সুফলের ছোট্ট ভগ্নাংশই সেই কাগজের মালিকের কাছে আসছে। পড়তায় পোষাচ্ছে না। নীট ফল, জমির সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্করহিত কলকেতা শহরের বাবুরা পাবনা বা যশোর তালুকের এক আনা অংশ খরিদ করে দিব্যি বছরের পর বছর রৌপ্যমুখদর্শন করতেন। বঙ্গ নবজাগরণের হোতাদের অনেকের সামাজিক ও আর্থিক ভিত্তি জমির কাগজ। যে বর্গাদারদের শ্রম থেকে ওই এক আনার আয় তাদের জগৎ ব্রাহ্ম প্রার্থনা মন্দির বা দেবদের চন্ডীমন্ডপ থেকে বহুদূর। বস্তুত তাদের ভাগ কমাতে পারলে বাবুদের ভাগ বাড়ে। ব্রাহ্মবোধিনী পত্রিকার আয়তন বর্ধিত হয়, দুর্গাপুজোর মুজরোয় খাস লক্ষ্ণৌয়ের তওয়ায়েফ তশরীফ রাখেন।


তবে নীচমহল চুপচাপ ছিল না মোটেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে একাধিক কৃষি বিদ্রোহ ঘটে। পাবনার ১৮৭৩-এর বিদ্রোহ উল্লেখযোগ্য। এর আঁচ পুববাংলার অন্য জেলাতেও লাগে। ১৮৮৫ সালে সরকার বাহাদুর
Bengal Tenancy Act পাশ করেন। জমিদারদের ক্ষমতা খর্ব করে তাদের বাগে আনার চেষ্টা করা হয়। রায়তদের জমি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন হয়। তবে ভাগচাষিদের কী হবে, তাদের জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে কিনা এই বিষয়ে আইন নিশ্চুপ। ফলে ভাগচাষিদের শোষণ চলতে থাকে। বিষম পরিস্থিতিকে সামাল দিতে ১৯২৩ সালে কের সাহেবের কমিটি বসানো হয়। কমিটি বলে যে ভাগচাষি নিজেই চাষের গরু, বীজ সরবরাহ করছে তাকে টেনান্ট হিসেবে ধরা হোক। তাকে জমির মালিক আচমকা তুলে দিতে পারে না।


মৌচাকে যেন ঢিল পড়ল। বাংলায় জোতদার নামে একটি ভুঁইফোড় শ্রেণীর উদ্ভব বেশ কিছু দশক ধরে হয়ে আসছিল। এরা জমিদারদের মত বিশাল জমির অধিপতি নয়। ধনী কৃষক বলা যেতে পারে। জোতদাররা প্রায়শঃ নিজেদের জমি নিজেরাই চাষ করে, উদ্বৃত্ত জমি বর্গাদারদের ভাড়া দেয়। মহাজনী করেও জোতদাররা আয় করে। ধারের সুতোয় বেঁধে ছোট চাষির হাত থেকে জমি ছিনিয়ে নিয়ে এদের বাড়বাড়ন্ত। ফলে খাতক নিজের জমিতেই মহাজন-জোতদারের ভাগচাষিতে রূপান্তরিত হচ্ছিল। কংগ্রেস পার্টি জমিদারদের সাবেক দল। ঊনিশ শতকের শেষার্ধে বিভিন্ন
Tenancy Act পাশ করে সরকার জমিদারদের ডানা ছেঁটে দেয়। তার সুফল কিন্তু নিচুতলাতে তেমন পড়ে নি। হায়ারার্কিতে জমিদারদের পরে থাকা জোতদাররা লাভবান হয়। ফলে কংগ্রেস পার্টির উঁচুমহলে জোতদারদের হাঁকডাক কম নয়। ১৯২৫ থেকে ১৯২৮ কংগ্রেস ও স্বরাজ পার্টি কের কমিটির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার চালিয়ে যায়। যুক্তি হল, গ্রামীণ পরিস্থিতি বেশ শান্তিপূর্ণ। বর্গাদারদের হাতে উচ্ছিন্ন না হওয়ার অধিকার দিলে বলশেভিকদের পোয়াবারো হবে। সরকার বাহাদুর কি রাশিয়ায় কী হয়েছে ভুলে যাচ্ছেন? উল্লেখ্য মুসলিম নেতারা বর্গাদারদের পক্ষে ছিলেন। আরো উল্লেখ্য বিধানচন্দ্র রায় কংগ্রেসের রক্ষণশীলতার সাথেই ছিলেনঃ বর্গাদারদের অধিকার দেওয়ার উচিত সময় আসে নি। শেষে ইংরেজ সরকার ছেড়ে দে মা বলে কের সাহেবের সুপারিশ ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করলেন। বর্গাদারদের আইনি মর্যাদা ভূমিহীন খেত মজুরদের বেশি কিছু থাকল না[3]


এর পরের পালা ফ্লাউড কমিশনের। ১৯৪০ সালে কয়েকটি যুগান্তকারী সুপারিশ দিলেন ফ্লাউডসাহেব। জমিদারি প্রথা তুলে দিতে হবে, বর্গাদারদের রায়তদের মত জীবিকার অধিকার দিতে হবে, জমির মালিক মর্জিমাফিক উচ্ছেদ করতে পারবে না। বর্গাদাররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অর্ধেক বা তার কম ফসলের ভাগ পান, যা অন্যায্য। জমির মালিক কিচ্ছুটি না করে বাকি অর্ধেক ফসল পেয়ে যেতে পারেন না। বর্গাদারের হিস্যা বাড়িয়ে তিনের দু’ভাগ করতে হবে (এর থেকে তেভাগা নামটির সৃষ্টি)। কংগ্রেসি বা স্বরাজিদের বর্গাদারবিরোধিতা সহজবোধ্য। মজার ব্যাপার হল কমিউনিস্ট পার্টি কিন্তু বৈপ্লবিক অবস্থান নেয়নি। ফ্লাউড কমিশনের কাছে সিপিআই যে নথি পাঠায় তাতে কোথাও বর্গাদারদের ভাগ বাড়ানোর বা তাদের ওপর জুলুম দূর করার কথা নেই। উলটে কিসান সভার হয়ে বঙ্কিম মুখার্জিরা বললেন চাষিদের মধ্যে খাজনা বয়কটের ক্যাম্পেন পার্টি করে নি, সব অপপ্রচার। কিসান সভা সুনিশ্চিত করবে সরকারের খাজাঞ্চিখানায় যাতে সময়মত খাজনা জমা পড়ে।


অর্থাৎ তেভাগার যে মূল দাবিগুলো নিয়ে ১৯৪৫ থেকে রাজ্য তোলপাড় হবে, কমিউনিস্ট পার্টি যার রাজনৈতিক দিশা দেওয়ার চেষ্টায় থাকবে, মাত্র পাঁচ বছর আগে সেগুলো পার্টির বিবেচনাতে ছিল না। বস্তুত আরেকটু খতিয়ে দেখলেই পরিস্কার হবে তেভাগা আন্দোলন তৃণমূলস্তর থেকেই উঠে এসেছিল। অপ্রস্তুত দল তাকে গ্রহণ করেছিল মাত্র। ধারণ করতে পারেনি। আন্দোলন আগে আগে নিজের পথ বেছে নিয়েছে। দল তাকে নেতৃত্ব দেওয়া দূরের কথা, অনুসরণ করে গেছে। উদাহরণ হিসেবে তেভাগা আন্দোলন ফ্লাউড কমিশনের দাবিকে (দুই-তৃতীয়াংশ হিস্যা) তুলেছে। কিন্তু ফ্লাউড কমিশনের অন্য একটি সুপারিশ, বর্গাদারদের বর্গার অধিকার, কিন্তু তেভাগায় নেই। পার্টি নিশ্চয়ই ফ্লাউড সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিল। বর্গার অধিকারকে আন্দোলনে রাখল না কেন? উপনিবেশি রাষ্ট্রের নিয়োগ করা কমিশন যতদূর যেতে পারে পার্টি ততটুকুও যেতে পারে নি।


দলের মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের কথা যদি স্মরণ করি তাহলে এই উপসংহার টানা দুষ্কর নয় যে আন্দোলন যখন দলের শ্রেণীস্বার্থকে বিঘ্নিত করেছে আন্দোলন পিছু হটেছে। দলের দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতি চেনার এই তো কষ্ঠিপাথরঃ শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনকে যখন পার্টি পেছন থেকে টেনে ধরতে চায়। দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চলে তেভাগা সাড়া জাগাতে পেরেছিল তার একটা বড় কারণ সেখানে বর্গাদার-মালিকের জাতিগত মিশ্রণ ও পার্টির আঞ্চলিক নেতৃত্ব আন্দোলনের জন্য অনুকূল ছিল (বর্গাদাররা মূলত ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে নিয়ে আসা চা-শ্রমিকরা ছিলেন, জমির মালিকানা স্থানীয় রাজবংশীদের হাতে)। অন্যদিকে বর্ধমান জেলায় তেভাগার বিশেষ প্রভাব পড়েনি। তার মানে এই নয় বর্ধমানে বর্গাপ্রথা কিছু মাত্রায় কম ছিল। হিলসাহেব বিশ-তিরিশের দশকের বর্ধমানের জমির বন্দোবস্ত নিয়ে লিখছেন জেলার এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশ জমি সম্ভবত বর্গাতে চাষ হয়। তাহলে রহস্যটা কী? বর্ধমানের জমিমালিকরা কি বর্গাদারবৎসল ছিলেন তাই তেভাগার আন্দোলন বিশেষ কল্কে পায়নি? বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন পার্টি ও কিসান সভায় নেতৃত্ব মধ্য চাষিদের হাতে ছিল। এরা বর্গাদারদের ভাড়াতে জমি দেন। বর্গাদারদের বেশি হিস্যা দিলে দলের মাথায় বসে থাকা মানুষগুলোর হিস্যা কমে যায়। পার্টি বর্ধমানে তেভাগা ছড়াতে দেয়নি।


তেভাগা পর্বে পার্টির শুধু শ্রেণীচরিত্র নয়, তার পিতৃতান্ত্রিক চরিত্রেরও খানিকটা উন্মোচন হয়। এ খুব অপ্রত্যাশিতও নয়, শ্রেণী ও পিতৃতন্ত্র একে অপরের হাত ধরে চলে। তেভাগার একটি প্রধান চরিত্র গাঁ-গঞ্জের মহিলাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরকালের ছোটগল্পগুলো স্মরণ করুন। আন্দোলনের নেতাদের গ্রেফতার করতে গাঁয়ে পুলিশ নেমেছে, তাদের রক্ষা করতে প্রথম সারিতে শক্ত চোয়ালের মহিলারাই। মেয়েরা বর্গার জমি থেকে ধান কেটে এনে জীবনে প্রথমবার নিজেদের উঠোনে রাখতে পারছেন, তারপর লক্ষ্মীজ্ঞানে প্রণাম করছেন (তেভাগার অন্যতম দাবি ছিল ধান মাড়াই মালিকের নয় বর্গাদারের উঠোনে হবে)। লোকসংস্কৃতিগত আবেগের এই আবেদন অস্বীকার করা যায় না। ময়মনসিংহ থেকে দিনাজপুর, যশোর হয়ে মেদিনীপুর, নানান জায়গায় তৃণমূলস্তরে ‘নারী বাহিনী’ নামে জঙ্গী ইউনিট গড়ে উঠছে। এরা সশস্ত্র। অস্ত্র বলতে অবশ্য ঝাঁটা, বটি দাঁ, লাঠি, কখনো সখনো বল্লম। পুলিশ, জোতদারের লেঠেলের হামলার খবর ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ওয়্যারলেস শাঁখ। গবেষক পিটার কাস্টার্স নারী বাহিনীকে অভিহিত করেছেন সেমি মিলিশিয়া বলে। এরা সশস্ত্র, কিন্তু সেই অর্থে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়।


বস্তুত নারী বাহিনীর গঠনের দাবি নিচের থেকেই উঠে এসেছিল এরকম অনুমান করা যায়। ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকায় দু’হাজার চাষির এক কিসান সভার জমায়েতের বর্ণনা ‘শৃঙ্খলিত মৃত্তিকা’ নামের বইটিতে পাওয়া যাবে। হঠাৎ এক চাষি রমণী দাঁড়িয়ে উঠে মেয়েদের সশস্ত্র বাহিনীর দাবি জানালেন। তাঁকে সমর্থন করতে এগিয়ে এলেন আরো মেয়েরা। যদি পুরুষরা অস্ত্র ধরতে পারে মেয়েরা কেন নয়? পুরুষরা ঘরছাড়া হলে মেয়েরা কীভাবে আত্মরক্ষা করবে? হতচকিত পুরুষদের ও কিসান সভার নেতাদের সামনেই গড়ে উঠল মহিলাদের পৃথক সশস্ত্র বাহিনী, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।


বস্তুত মেয়েদের দিকটা দেখার জন্য পার্টির সংগঠন আগের থেকেই ছিল, যার নাম ছিল
MARS, মহিলাদের আত্মরক্ষার লীগ। মার্সের সুতো বাঁধা থাকত মধ্যবিত্ত নেতা ও সচ্ছল চাষিদের বাড়িতে। অন্যদিকে নারী বাহিনীর বর্ণগত পরিচয় পার্টির প্রথমসারির থেকে আলাদা। মূলত তফসীলি জাতি ও উপজাতির মহিলারা এর উপাদান। অনেক মহিলাই ক্ষেতে স্বামী বা সন্তানের সাথে কাজ করতেন। একটা বড় সংখ্যা বর্গাদার ছিলেন না, ভূমিহীন খেত মজুর ছিলেন (তেভাগার দাবি যদিও বর্গাদারদের স্বার্থে, ভূমিহীন খেত মজুররাও এতে অংশ নিয়েছিলেন)। অর্থাৎ অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি, উঁচুজাতের বর্ণগতশোষণ ও মালিকদের যৌনশোষণকে যদি রাখি তেভাগায় নারী বাহিনীর উৎপত্তির কারণ বোঝা খুব দুরূহ থাকে না।


দুরূহ থাকে না ৪০ দশকের অশান্ত পরিস্থিতিকে বৈপ্লবিক মোড় দিতে পার্টির অনীহাকে নেতৃত্বের শ্রেণীপরিচয়ের আতশ কাঁচ দিয়ে চিনে নিতে। ঐতিহাসিক সুমিত সরকার ৪০ দশক, স্বাধীনতা ও দেশভাগ পর্যায়কে সনাক্ত করেছেন সেসময়ের কংগ্রেস নেতৃত্বের সুবিধাবাদের পরিচয় হিসেবে। উত্তাল পরিবর্তনকামী জনগণকে যদি ধার্মিক সংকীর্ণতার বাইরে নিয়ে গিয়ে ভাতকাপড়ের প্রশ্নে রাজনীতিকরণ করা যেত হয়তো মুসলিম বা হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে এতটা ছাড় দেওয়ার দরকার পড়ত না। শোষিত উপনিবেশের সব মানুষ এক দেশ হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করত। কিন্তু কংগ্রেসি রাজনীতির সে সময় প্রধান লক্ষ্য দেশভাগ আটকানো বা অর্থনৈতিক অধিকারের লড়াই নয়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাধীন দেশের ক্ষমতা দখল। দেশভাগ-স্বাধীনতাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেশের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা যায়।


বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে এক ধরনের অভিযোগ হয়তো কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে আনা যায়। ১৯৪৩-এর মণ্বন্তরের দগদগে ক্ষতচিহ্নে সময়ের প্রলেপ পড়তে না পড়তে বাংলার কৃষক সমাজ এক আশ্চর্য লড়াই প্রস্তুত করে। ধানগাছের শেকড় থেকে উঠে আসা আগুনের দরকার ছিল একটি মৃৎপাত্রের, আগুনের তদারকি করার এক মশালচির। অন্যথা, বৃষ্টি-বাত্যায় আগুনের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল নয়। যে মশালচির ওপর আগুনের ভরসা ছিল তার আবার দুপুর দুপুর মাছভাত সাবড়ে ভাতঘুম দেওয়ার আগে সিগারেটে আগুন ধরিয়ে সুখটান দিতে বেশি আগ্রহ। সন্দেহ নেই তেভাগার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব গভীর ও সুদূরপ্রসারী। তবে অগণিত হত্যা, ধর্ষণ, গ্রেফতারের মধ্যে দিয়ে এক বছরে আন্দোলনের এন্তেকাল হয়তো বোঝায় স্বতঃস্ফূর্ততা একা সফল হয় না।


সূত্রাবলীঃ


অমিত ভাদুড়ি, ১৯৭৬,
“The Evolution of Land Relations in Eastern India under British Rule”, Indian Economic and Social History Review, March, Vol 13, No 1, pp 45-58.


দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, ২০০১, “Tebhaga Movement in Bengal: A Retrospect”, Economic and Political Weekly, Vol. 36, No. 41, pp. 3901-3903+3905- 3907.


পার্থ চ্যাটার্জি, ১৯৮৬,
“The Colonial State and Peasant Resistance in Bengal 1920-47”, Past and Present, No 110, pp 169-204.


পিটার কাস্টার্স, ১৯৮৬,
“Women’s Role in Tebhaga Movement”, Economic and Political Weekly, Vol. 21, No. 43, pp. WS97-WS104.


সুমিত সরকার, ১৯৮২,
“Popular Movements and National Leadership 1945-47”, Economic and Political Weekly, Vol. 17, No. 14/16, Annual Number, pp. 677-680+682-683+685-686+688-689.


সুমিত সরকার, ১৯৮৩,
Modern India, 1885-1947, Macmillan India, New Delhi.


[1] দুটো পর্যায়ে হয়। প্রথম নভেম্বর ১৯৪৫, দ্বিতীয় ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬; সব মিলিয়ে প্রায় ১২০ হত, ৫০০ আহত।
[2] সারা দেশে ১৯৪৬ সালে প্রায় ১৭০০টি ধর্মঘট হয়, ২০ লক্ষ শ্রমিক অংশ নেন। এর আগে কোনো বছরে ধর্মঘটের সংখ্যা ১০০০ পার করেনি বা ৮ লক্ষের বেশি শ্রমিককে টানতে পারেনি। ধর্মঘটগুলো মূলত কলকাতা ও বোম্বাই এই দুই শিল্পাঞ্চলে হয়।
[3] লক্ষ্যণীয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে বর্গাদারদের নীচে খেত মজুররা রয়েছে। বর্গাদাররা এক বছর বা এক মরসুমের জন্য জমি ভাড়া নিয়েছে, ফলে সে সময়টুকু তাদের জীবিকা নিশ্চিত। খেত মজুরদের সাথে জমির কোনো সম্পর্ক নেই, তারা উৎপাদনের উপকরণহীন সর্বহারা। আজকে কোথাও কাজ পেল তো কিছু জুটল, কাল হয়তো তাও নেই।

One Response to “তেভাগার আয়নায় কমিউনিস্ট পার্টি”

  1. Dilruba Mahbuba said

    Informative

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: