বা ঙা ল না মা

দেশভাগের সাম্প্রতিক ইতিহাস চর্চার আলোকে ‘দ্যা মার্জিনাল মেন’

Posted by bangalnama on December 22, 2010


- লিখেছেন ত্রিদিব সন্তপা কুণ্ডু

১৯৯৭ সালে যখন দেশভাগ নিয়ে গবেষণা করব মনস্থির করলাম তখন আমার পাঠ্য তালিকায় স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে ছিল শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক প্রফুল্ল চক্রবর্তীর বহু আলোচিত/ সমালোচিত বইটি, ‘দ্যা মার্জিনাল মেন’ (The Marginal Men) বস্তুতপক্ষে এটি কোনো ব্যতিক্রমি ঘটনা নয়। কারণ আমাদের প্রজন্মে যারা দেশভাগ নিয়ে কাজ করছেন এবং আগামী দিনে করবেন তাদের কাছে এটি একেবারে প্রাথমিক বই, যাকে বাদ দিয়ে পূর্বভারতে দেশভাগ সংক্রান্ত আলোচনা শুরু করা শক্ত। ১৯৯০ সালে ঐ বইটি প্রকাশিত হবার পর থেকেই তা গবেষকমহলে এবং সাধারণ পাঠকমহলে অত্যন্ত আদৃত। অধ্যাপক চক্রবর্তীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হন বা না হন তাঁকে উপেক্ষা করা শক্ত – ‘দ্যা মার্জিন্যাল মেন’ বইটির সবচেয়ে বড় সাফল্য বোধহয় এটাই। বিগত সহস্রাব্দের শেষ দিক থেকে দেশভাগের ইতিহাস নিয়ে যে ব্যাপক চর্চা পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয় তার অন্যতম পথিকৃত ছিলেন অধ্যাপক প্রফুল্ল চক্রবর্তী। ‘দ্যা মার্জিনাল মেন’ তাঁর দীর্ঘ গবেষণার ফসল। মৃত্যুর কিছুকাল আগে তাঁর সঙ্গে তাঁর কল্যাণীর বাসভবনে বেশ কিছুক্ষণ দেশভাগের ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার সৌভাগ্য হয়েছিল। বইটি লিখতে গিয়ে তিনি যে কতটা গভীর ভাবে ঐ বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন তা অকল্পনীয়। কারণ দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা বা উদ্বাস্তু আন্দোলন নিছকই তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল না, বা কোন intellectual exercise ছিল না, গোটা বিষয়টি তাঁর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিল।


পশ্চিমবঙ্গে দেশভাগ নিয়ে চর্চা যে অধ্যাপক চক্রবর্তীর হাত ধরে শুরু হয়েছিল এমনটা নয়। বিক্ষিপ্ত চর্চা শুরু হয়েছিল কিছুকাল আগে থেকেই। উদ্বাস্তু সমস্যায় জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার চল্লিশের দশকের শেষ দিকেই ইন্ডিয়ান স্টাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আগত উদ্বাস্তুদের উপর একটি সমীক্ষা করায় যা থেকে প্রথম পর্বে আগত উদ্বাস্তুদের আর্থ-সামাজিক অবস্থানটি ধরা পরে। পরবর্তীকালে ঐ সমীক্ষার উপর ভিত্তি করে কান্তি পাকড়াশি তাঁর
The Uprooted: A Sociological Survey of the Refugees in West Bengal (1971) বইটি লেখেন। এ-প্রসঙ্গে আর একটি সমীক্ষার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ১৯৫০ এর দশকের শেষে প্রকাশিত হয় বি.এস. গুহ-র Studies in Social Tension among the Refugees from East Pakistan (1959)। এর পর ১৯৮০-র দশকে Centre for Studies in Social Sciences এর উদ্যোগে বেশ কিছু গবেষণা পরিচালিত হয়। অশোক সেন, অলোক ব্যানার্জী, প্রণতি চৌধুরী প্রমূখ বেশ কিছু কাজ করেন মূলত CMD-ভূক্ত এলাকায় উদ্বাস্তু আগমন ও তাঁদের বসবাসের ধরণ নিয়ে। এই বিক্ষিপ্ত কাজগুলি উদ্বাস্তু আগমন এবং তার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ইস্যুর উপর আলোকপাত করলেও দেশভাগ এবং উদ্বাস্তু সমস্যাকে একটি বড় ইতিহাসের ক্যানভাসে ধরার চেষ্টা করা হয়নি। সেই চেষ্টা প্রথম লক্ষ্য করা যায় প্রফুল্ল চক্রবর্তীর The Marginal Men-এ। অনেক দিন পর্যন্ত পেশাদার ভারতীয় ঐতিহাসিকরা স্বাধীনোত্তর পর্বের ইতিহাস চর্চা থেকে নিজেদের সচেতন ভাবে সরিয়ে রাখতেই অভ্যস্ত ছিলেন। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পঞ্চাশ বছর পর ১৯৪৭ এর লক্ষণরেখা অতিক্রম করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। কিন্তু অধ্যাপক চক্রবর্তী ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির ঐতিহাসিকদের একজন যিনি সেই লক্ষণরেখা তাঁর সমসাময়িকদের থেকে অনেক আগেই অতিক্রম করে দেশভাগের ইতিহাস চর্চা শুরু করেছিলেন।


‘দ্যা মার্জিনাল মেন’-এর প্রকাশ দেশভাগের ইতিহাস চর্চার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ তথ্যের উপর ভিত্তি করে অধ্যাপক চক্রবর্তী পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের নিদারুণ দুর্ভোগ, অকল্পনীয় সংগ্রাম এবং বদলে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির আদলটিকে ধরার চেষ্টা করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। ‘দ্যা মার্জিনাল মেন’-এর কাঠামোটি গড়ে উঠেছে মূলতঃ তিনটি বিষয়কে আশ্রয় করে–


* তিনি অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের নিদারুণ দুর্ভোগের কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন- বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের আগমন, রেলওয়ে প্লাটফর্মে, ক্যাম্পে, কলোনীতে তাঁদের নরকযন্ত্রণা ভোগ, উদাস্তু পুনর্বাসনে সরকারী উদাসীনতা ইত্যাদি তাঁর লেখাতে দারুণভাবে এসেছে।


* তিনি উদ্বাস্তুদের প্রতিরোধ আন্দোলনের একটি নির্ভরযোগ্য আলেখ্য রচনা করেছেন যার নেতৃত্বে ছিল
UCRC (United Central Refugee Council) এবং পিছন থেকে তাকে সাহায্য করে বামপন্থী দলগুলি।


* এর উপর ভিত্তি করে বইটির তৃতীয় এবং শেষ অংশে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের এক নতুন ভাষ্য হাজির করেন যা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক বাঁধে। অধ্যাপক প্রফুল্ল চক্রবর্তী দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে ভাগ্য বিড়ম্বিত উদ্বাস্তুরা ক্রমশঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৫০-৬০ এর দশকে উদ্বাস্তুরা তাই রাজ্য রাজনীতিতে বামপন্থীদের ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধির অন্যতম উপাদান হিসাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। উদ্বাস্তু এবং বামপন্থীদের এই বোঝাপড়াই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির চেহারাটিকে দ্রুত বদলে দেয়। প্রথমদিকে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুরা বামপন্থীদের প্রতি বিশেষ আগ্রহী ছিল না। বরং ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের প্রতিই তারা অধিকতর আস্থাশীল ছিল। তারা আশা করেছিল যে কংগ্রেস তাদের পুনর্বাসনের যথাযথ ব্যবস্থা করবে। কিন্তু কংগ্রেস সরকারের কাজকর্মে তারা আশাহত হয় এবং বামপন্থীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। বামপন্থী দলগুলি দ্রুত উদ্বাস্তুদের মধ্যে তাদের সংগঠন বাড়াতে থাকে। ১৯৫৯ সালেই
UCRC-র নেতৃত্ব CPI এর হাতে চলে যায়। পরবর্তীকালে CPI(M) ঐ সংগঠনের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তারা যেমন বামপন্থী দলগুলির নেতৃত্বে পরিচালিত গণ আন্দোলনগুলিতে বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেন তেমনি তাদের নিজস্ব আন্দোলন সংগ্রামগুলিতেও তারা বামপন্থীদের সক্রিয় সমর্থন লাভ করেন। অধ্যাপক চক্রবর্তীর মতে পশ্চিমবঙ্গে CPI বা CPI(M) যথার্থ অর্থে শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রগণ্য বাহিনী ছিল না। কারণ পশ্চিমবঙ্গে সেই অর্থে কোন শ্রমিকশ্রেণীর অস্তিত্ব ছিল না। তাঁর মতে উদ্বাস্তুদের সমর্থন লাভই পশ্চিমবঙ্গে বামেদের ক্ষমতায় এনেছিল। বামদলগুলি কার্যতঃ উদ্বাস্তুদের ব্যবহার করেছিল তাদের ক্ষমতায় উত্তরণের মই হিসাবে।


অধ্যাপক চক্রবর্তীর এই তত্ত্ব নিঃসন্দেহে যথেষ্ট বিতর্কিত। এটা বিশ্বাস করা খুব শক্ত যে বামদলগুলি উদ্বাস্তুদের নিছক ব্যবহার করেছিল ক্ষমতায় পৌঁছনোর মই হিসাবে। এছাড়াও
refugee syndrome দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা কতটা যুক্তিযুক্ত সে নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকে যায়। তবে এসব সত্ত্বেও মার্জিনাল মেন-এর গুরুত্বকে কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। বস্তুতপক্ষে এই বইটির মধ্য দিয়েই দেশভাগের ইতিহাস চর্চা এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে।


১৯৯০ এর দশকের শেষ দিক থেকেই পশ্চিমবঙ্গে দেশভাগ নিয়ে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়, যার পিছনে মার্জিনাল মেন-এর একটি প্রচ্ছন্ন প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। দেশভাগের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে অধ্যাপক চক্রবর্তীর কাজ দেশভাগের ইতিহাস চর্চার ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ করে। ঐ কাজের কথা মাথায় রেখে অনেকেই দেশভাগের সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে দীপেশ চক্রবর্তী “ছেড়ে আসা গ্রাম” এর উপর ভিত্তি করে একটি অসাধারণ প্রবন্ধ লিখলেন
(“Remembered Villages: Representation of Hindu-Bengali Memories in the Aftermath of the Partition”, Economic and Political Weekly, vol.31, no.32, August 10, 1996)। রণবীর সমাদ্দার ১৯৯৭ সালে একটি সংকলন প্রকাশ করেন (Reflections on Partition in the East, New Delhi, Vikash, 1997) যেখানে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ সংকলিত হয় যেগুলিতে বাংলায় দেশভাগের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি লেখেন The Marginal Nation (1999) যেখানে দেশভাগের অন্তঃসারশূন্যতাকে তুলে ধরেন তাঁর পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় ক্ষেত্রসমীক্ষার উপর ভিত্তি করে।


প্রফুল্ল চক্রবর্তীর মার্জিনাল মেন প্রকাশের ঠিক এক দশক পরে প্রকাশিত হল আর একটি বিশেষ উপযোগী বই, প্রদীপ কুমার বোস সম্পাদিত ‘রিফিউজিস ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’। এই বইটিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেগুলি দেশভাগের ইতিহাস চর্চাকে সমৃদ্ধ করে। প্রফুল্ল চক্রবর্তী যে কাজ শুরু করেন তাকে অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে যান পরবর্তী গবেষকরা। মার্জিনাল মেন-পরবর্তী দেশভাগের ইতিহাস চর্চায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন সন্দেহ নাই।


উদ্বাস্তু-বামরাজনীতির গাঁটছড়া, যাকে আশ্রয় করে প্রফুল্ল চক্রবর্তী পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের ভাষ্য রচনা করেছিলেন, তার রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করেছেন অভিজিৎ দাশগুপ্ত। তিনি দেখান যে আশির দশক থেকে বিজেপি এবং নব্বই এর দশক থেকে তৃণমূল কংগ্রেস উদ্বাস্তু-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে দ্রুত তাদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে উদ্বাস্তুরা তাদের প্রান্তিক অবস্থান কাটিয়ে উঠতে পারেননি যা ঐ অঞ্চলগুলিকে বামবিরোধী রাজনীতির উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করে। কলকাতা ও শহরতলির হকার উচ্ছেদ অভিযান (অপারেশন সানশাইন নামে যা খ্যাত বা কুখ্যাত) উদ্বাস্তুদের বামরাজনীতি থেকে ক্রমশ দূরে ঠেলে দেয়। যে উদ্বাস্তুরা এক কালে বামফ্রন্টের ভোট ব্যাংক হিসাবে পরিচিত ছিলেন তাদের একটি বড় অংশ বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে ঢলে পরে। ১৯৮৯ এর লোকসভা নির্বাচন থেকেই এই প্রবণতা ক্রমশ পরিষ্কার হতে থাকে। ১৯৯৮ সালে দমদম লোকসভা কেন্দ্র বামফ্রন্টের হাতছাড়া হয় এবং পরের বছর নদীয়ার কৃষ্ণনগরেও বিজেপি জয় লাভ করে। তিনি উদ্বাস্তুদের এই রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তনের তিনটি পর্যায় দেখিয়েছেন। প্রথমে তারা ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন। পরে তারা কংগ্রেসের প্রতি আস্থা হারিয়ে বামপন্থীদের পাশে এসে দাঁড়ান। আশির দশকের শেষ দিক থেকে তারাই আবার এক অন্য ধরনের রাজনীতির প্রতি আনুগত্য দেখাতে শুরু করেন যাকে তিনি কনফেশনের রাজনীতি বলে অভিহিত করেছেন। উদ্বাস্তু রাজনৈতিক আনুগত্যের এই সতত পরিবর্তনশীল দিকটি বিশেষ আকর্ষণীয়। এই বিষয়টিকে মাথায় রেখে প্রফুল্ল চক্রবর্তীর তত্ত্বটিকে নতুন করে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। উদ্বাস্তুরা বামেদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছিল না তারা বামেদের ব্যবহার করেছিল তাদের নিজেদের স্বার্থে সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।


পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের প্রফুল্ল চক্রবর্তীকৃত ভাষ্যে উদ্বাস্তু-বাম জোটের উপরই মূল জোর দেওয়া হয়েছে। রাজ্য কংগ্রেস রাজনীতির দুর্বলতা, গোষ্ঠিদ্বন্দ ইত্যাদি সেভাবে আলোচনায় আসেনি। এই বিষয়গুলির উপর আলোকপাত করেছেন জয়া চ্যাটার্জী
(The Spoils of Partition: Bengal and India, 1947-1967, CUP, 2007) এবং শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় (Decolonization in South Asia: Meanings of freedom in post-independence West Bengal, Routledge, 2009), তাঁদের সাম্প্রতিক কালে প্রকাশিত দুটি বই-এ ।এই বই দু’টিকে যদি আমরা মার্জিনাল মেন এর পরিপূরক হিসাবে নিই তাহলে আমরা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একটি অধিকতর পরিষ্কার ছবি পেতে পারি।


মার্জিনাল মেন এর মূল জোর উদ্বাস্তু আন্দোলন, উদ্বাস্তু-বামরাজনীতির জোটবন্ধন এবং তার সূত্র ধরে বামেদের ক্ষমতায় উত্তরণ হলেও তার পটভূমিকা হিসাবে তিনি দেশভাগজনিত দুর্ভোগের একটি প্রাথমিক বিবরণ তুলে ধরেন প্রথম তিনটি অধ্যায়ে যা পরবর্তীকালে ঐ বিষয় নিয়ে নতুন গবেষণাকে উৎসাহিত করে। নব্বই এর শেষদিক থেকে উদ্বাস্তুদের শারীরিক ও মনঃস্ত্বাতিক দুর্ভোগ নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা শুরু হয়। উদ্বাস্তুদের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ঐ সময়ের ইতিহাসের পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা শুরু হয়। দেশভাগের অভিজ্ঞতা মেয়েদের কাছে যে অনেকটাই আলাদা ছিল তা বলাই বাহুল্য। লিঙ্গ দৃষ্টিকোণ থেকে মেয়েদের অভিজ্ঞতাকে বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে বিভিন্ন লেখাপত্রের মধ্য দিয়ে। যশোধরা বাগচী, শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত, গার্গী চক্রবর্তী প্রমুখের কাজ এক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলা যেতে পারে।


মার্জিনাল মেন প্রকাশের পর দু’দশক পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে দেশভাগের ইতিহাস চর্চার তালিকায় বহু নতুন গ্রন্থের সংযোজন ঘটেছে, বহু নতুন বিষয়ের সংযোজন ঘটেছে। কিন্তু দেশভাগের ইতিহাস চর্চায় এখনও অনেক কিছু বাকী আছে বলেই আমার মনে হয়। দুই বাংলার অভিজ্ঞতাকে এক জায়গায় মেলাতে না পারলে একটি অখণ্ড চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। কিছু বিক্ষিপ্ত উদ্যোগ ছাড়া সেধরনের বড় আকারের উদ্যোগ এখনও তেমন চোখে পরে না। আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতেই সেই উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং সেটিই হবে আমার মতে প্রয়াত ঐতিহাসিক প্রফুল্ল চক্রবর্তীর কাজের প্রতি যোগ্য সম্মান প্রদর্শন।


তথ্যপঞ্জী :

১) Prafulla K. Chakrabarti, The Marginal Men: The Refugees and the Left Political Syndrome in West Bengal, Kalyani, Lumiere Books, 1990
২) দেশভাগের ইতিহাসচর্চার ধারা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখতে পারেন
“The Aftermath of the Partition of Bengal, 1947: A Historiographical Survey” http://bengalpartitionstudies.blogspot.com/2006/08/aftermath-of-partition-of-bengal-1947.html
৩)
Avijit Dasgupta, “The politics of agitation and confession: displaced Bengalis in West Bengal” in Roy, Sanjay K. (ed.), Refugees and Human Rights, Jaipur and Delhi, Rawat Publications, 2001

About these ads

One Response to “দেশভাগের সাম্প্রতিক ইতিহাস চর্চার আলোকে ‘দ্যা মার্জিনাল মেন’”

  1. lokendra sengupta said

    tridib babu’r desh bhaager proriprekshyite rajnoitik aalochonaa monograahee, ullekhito bibhinno gronther khnoj o ei saathe paaoaa gelo.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 54 other followers

%d bloggers like this: