বা ঙা ল না মা

প্রসঙ্গ সিলেটি ভাষা

Posted by bangalnama on September 13, 2010


– লিখেছেন সঞ্জীব দেবলস্কর

(১)


লোকে বলে সিলেটি ‘ভাষা’। আসলে এটা ‘উপভাষা’। ইংরেজিতে যাকে বলে ডায়লেক্ট। একটি মূল ভাষার অন্যতম উপাদানই হ’ল এর উপভাষা, যাকে আঞ্চলিক ভাষাও বলা চলে। অনেকগুলো অঞ্চলের সমষ্টি যেমন একটি প্র-দেশ, কিম্বা দেশ, তেমনি অনেকগুলো আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষার সমষ্টিই হ’ল একটি মূল ভাষা, যাকে ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন মান্য চলিত ভাষা। মূল ভাষার সঙ্গে এ উপভাষার সম্পর্ক রাজা আর প্রজার সম্পর্ক নয়, সিলেটিতে বললে, জমিদার-রাইয়তের সম্পর্ক নয়, যদিও জমিদারি ব্যবস্থার মতো এখানেও রয়েছে খাজনা আদান প্রদানের প্রথা। রাইয়ত, অর্থাৎ প্রজা যেমন নিয়মিত খাজনা, সেটা নগদ পয়সাতেই হোক বা উৎপাদিত শস্যের বখরা, কিম্বা বেগার শ্রমদানের মাধ্যমেই হোক — তা দিয়ে জমিদারিকে টিঁকিয়ে রাখে, তেমনি উপভাষাও নিয়মিত শব্দ, পরিভাষার জোগান, পদ এবং পদান্তর, নিত্য নতুন প্রকাশ ভঙ্গি, প্রবাদ প্রবচন এসবের মাধ্যমে এই ভাষা-জমিদারিকে সমৃদ্ধ করে রাখে। প্রজা বিহীন জমিদার যেমন অস্তিত্বহীন, তেমনি উপভাষাহীন ভাষাও একটি অবাস্তব ধারণা। উপভাষা হল মূল ভাষার ‘ফিডার ল্যাঙ্গুয়েজ’, যার কাজ হচ্ছে মূল ভাষার প্রাণ রসের জোগান দেওয়া।


(২)


যারা সিলেটি বলেন অথচ শিষ্ট সমাজে এটা গোপন রাখতে চেষ্টা করেন (পারেন কি?), এরা সম্ভবত ভাবেন এরা কিছু একটা অন্যায় করছেন। কাউকে দোষারোপ করা হচ্ছে না, ওরা আসলে বিষ সেভাবে দেখেন না। এটা ওদের ভাবনায় আসেনি ওদের মুখের কথ্য উপভাষাটি যে মূল বাংলারই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এক বা একাধিক, কিম্বা অসংখ্য উপভাষা-পরিবারের অস্তিত্বই একটি জীবন্ত ভাষার অন্যতম চরিত্র লক্ষণ। যে ভাষার কোনো আঞ্চলিক রকমফের নেই, অর্থাৎ উপভাষা নেই, সে ভাষা তো মৃত ভাষা। প্রাচীন সংস্কৃত ভাষারও বিভিন্ন আঞ্চলিক রকমফের ছিল। খ্রিস্টিয় প্রথম সহস্রাব্দে যখন এ চরিত্র লক্ষণটি বজায় ছিল, তখনকার সৃজনশীল সাহিত্যে, উদাহরণ স্বরূপ, ‘মৃচ্ছকটিক’ নাটকে তো রীতিমত উপভাষার প্রয়োগ আমরা দেখেছি, কিন্তু মধ্যযুগ বা প্রগাধুনিক যুগে এসে এ ভাষা তার গতিশীলতা হারিয়েছে, কারণ ইতিমধ্যে ভাষাটির যে কোনো আঞ্চলিক উপভাষার ধারা সৃষ্টি হয়নি। কোনো জীবন্ত মানুষের মুখের বুলিতে এ ভাষা চর্চিত হয়নি, তাই ভাষাটি তার সমস্ত ঐশ্বর্য, সৃজন সম্ভাবনা নিয়েও হয়ে পড়েছে এক ‘তুষারিত গতিহীন ধারা’, ইংরেজিতে যাকে বলে স্টেটিক অবস্থা। বাংলা ভাষা যে একটি জীবন্ত ভাষা এর পরিচয় ধারণ করছে এর ঢাকাই, চাঁটগাইয়া, নোয়াখালি, বরিশালি, ময়মনসিংগি কিম্বা সিলেটি উপভাষাই। সংস্কৃত ভাষার কোনো উপভাষা নেই, তাই এ ভাষার মূলস্রোতের খাতটি শুকিয়ে গেছে। শুকনো গাঙ যেমন রেভিনিউ সেরেস্তার দাগ পাট্টার আশ্রয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় টিঁকে থাকে, (আসলে এটা অস্তিত্ববিহীনতাই), তেমনি উপভাষাবিহীন একটি মৃতভাষারও শেষ আশ্রয় যে পুঁথি, কিম্বা শুষ্ক বইপত্রের কফিন। অতএব, এ কথাটি এক্ষুনি জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, বাংলা ভাষার এক প্রান্তে যে সিলেটি উপভাষা রয়েছে, এজন্যেই মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষাটি বঁেচে বর্তে আছে।


(৩)


ভাষাতত্ত্বের মারপ্যাঁচে যাবার ইচ্ছা এবং সামর্থ্য কোনোটাই আমার নেই। সিলেটি ভাষা প্রসঙ্গে মূল ভাষা এবং আঞ্চলিক ভাষার আন্ত্য সম্পর্কের দিকে সামান্য আলোকপাত করেই ক্ষান্ত দেব। আপনারা মানতে পারেন, নাও মানতে পারেন, নাগরিক ভাষা কিন্তু নিতান্তই কেজো ভাষা। একটি ভাষা তার মৌলিক সৃজনশীলতার প্রধান স্তরটিতে পৌঁছে যায় প্রাক্্-নগরায়ণ অবস্থাতেই। এরপর তার বিকাশের আর বিশেষ কিছু থাকে না। বিকাশ বলতে যা, তা ওই প্রাক্-নগরায়ণ স্তরেই শেষ। বাকি তো সব ক্ষয়িষ্ণু জমিদারির মতো– পূর্বপুরুষের সঞ্চিত সম্বল কিছু কাঁচা মোহর, ওগুলো ভাঙিয়ে চলা। নাগরিক ভাষা, যাকে আবার শিষ্ট ভাষাও বলা হয়, এটা কিন্তু এক ধরনের স্থবির ভাষা। তার চলন বলন একেবারে মেপে ঝুঁকে, একেবারে ছাঁচে ঢালা। কিন্তু এটা তো আর একটা জীবন্ত ভাষার লক্ষণ হতে পারে না। তাই বলছিলাম, গতিশীল, বৈচিত্র্যময় ভাষার সমস্ত উপাদান এখনো রয়েছে গ্রাম জীবনে। ভাষার ভেতরের প্রাণ পাখিটি এখনো রয়েছে ওই গ্রামীণ মানুষের মুখে। নাগরিক মানুষের ছাপানো কেতাবের পৃষ্ঠা, কিম্বা মুদ্রাযন্ত্র পিষ্ট খবরের কাগজ, ডিস্ক বা সিডি রেকর্ড, টিভির পর্দা, রেডিও প্রোগ্রাম, কিম্বা ইন্টারনেটের ওয়েবসাইটে সেই জীবন্ত, সচল ভাষাটি নেই, তাকে এখানে খুঁজেও পাওয়া যাবে না। এ সঙ্গে এ কথাটিও বলতে হয়, গ্রামীণ ভাষার যে বৈচিত্র্য, ভিন্নতা, তা’ই তথাকথিত মেন স্ট্রিম ভাষার ঐশ্বর্য, তার শক্তির উৎস, দূর্বলতা নয়। দুটো জীবিত মানুষের চেহারা, কন্ঠস্বর, গায়ের রঙ, এমনকী স্বভাবেও যেমন পার্থক্য থাকে, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় বসবাসকারি নৃগোষ্ঠীর মানুষের মুখের বুলিতে পার্থক্য থাকে। মোদ্দা কথা হল আঞ্চলিক উপভাষা মূল ভাষার বা মান্য চলতি ভাষার, কিম্বা কেতাবি বুলিতে বলি, শিষ্টভাষার বিকৃতি নয়, মূল ভাষার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।


(৪)


নদীয়া শান্তিপুরের মৌখিক ভাষাটা ঐতিহাসিক কারণে বাংলার মান্য চলিত ভাষা হিসেবে গৃহীত হয়ে গেছে। এর মানে এ নয় যে সিলেট, ঢাকা, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া সহ অপরাপর অঞ্চলের ভাষা সব অশিষ্ট, পরিত্যাজ্য। বিশুদ্ধবাদীরা সচরাচরই উপভাষার প্রতি একটা অবজ্ঞার ভাব বজায় রাখেন। কার কথা বলব, আমাদের শ্রীচৈতন্যদেবও যে এ পথের পথিক। তিনিও তাঁর পূর্বপুরুষ সিলেটিদের ভাষা নিয়ে মৃদু কটাক্ষ করেছেন। ‘চৈতন্য ভাগবতে’র একটা উদ্ধৃতি দিই–


বঙ্গদেশি বাক্য অনুকরণ করিয়া
বাঙালেরে কদর্থেন হাসিয়া হাসিয়া।।


বিশেষ চালেন প্রভু দেখি শ্রীহট্টিয়া
কদর্থেন সেইমত বচন বলিয়া।।


তবে সেটা পাঁচশো বছর পূর্বের কথা। আর চৈতন্যদেব তো বাঙালি জাতির মুখে ভাষা দিয়েছেন, দিয়েছেন তার কবিতা, সংগীত। তিনি তো বাঙালি জাতিকে নিজস্বতায় প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন। তাঁর এ লীলার উল্লেখ আমরা করতে পারি, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারি না। বাঙালি তথা জাতি ধর্ম ভাষা নির্বিশেষে বিশ্ববাসীই তাঁর কাছে সর্বত ভাবে ঋণী। তবে অভিযোগ আমরা আনতে পারি আমাদের এ সময়ের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে যারা সঠিক ভাবে উপভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে তো সক্ষমই নন, অধিকন্তু এ উপভাষাকে একটা ভাষার স্খলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেও প্রয়াসী।


(৫)


তবে এখন সময় পাল্টেছে। এখন শিল্প সংস্কৃতির রাজধানী কলিকাতায় জিন্স পরা ইলেকট্রনিক যন্ত্র হাতে নাগরিক ব্যান্ডের শিল্পীরা দুনিয়ার যত বাঙাল কবির পদ গেয়ে আসর জমিয়ে রাখছে। সিলেটি হাসন রাজাকে তো কবিগুরু অনেক আগেই জগৎ সভায় প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন। সিলেটি বিপিন পাল থেকে আরম্ভ করে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরী হয়ে শাহ করিমের জয়জয়কার তো সর্বত্র। শুধু সিলেটি কেন, আজকাল সাঁওতালি দেহাতি ভাষায় গান, কবিতারও সমঝদারিত্ব বেড়েছে। আমাদের ভাষাপৃথিবীর এই যে বিস্তৃতির সূচনা, এটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বিভিন্ন ঔপভাষিক অঞ্চলের বাঙালিদের সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। হিন্দি ভাষার যতগুলো আঞ্চলিক রকমফের রয়েছে, এগুলোকে ওরা কখনোই অবহেলা করেননি। আজকের দিনে এ ভাষার সমৃদ্ধির মূলে এটাও একটা প্রধান কারণ। দিল্লির পাঞ্জাবি ঘঁেসা হিন্দি, দক্ষিণের মাদ্রাজি এবং অন্যান্য ভাষার মিশেলে দক্ষিণী-হিন্দি, মুম্বাইয়ের বস্তি অঞ্চলের হিন্দি, বাংলা ঘঁেষা হিন্দি, অসমিয়া ঘঁেষা হিন্দি, উত্তর কাছাড়ে বিভিন্ন জনজাতিদের যোগাযোগের জন্য তৈরি হওয়া হাফলঙ হিন্দি কি আমাদের সামনে উদাহরণ নয়?


(৬)


সিলেটি ভাষা নিয়ে কিছু বলতে হলে ওই ভাষাঅঞ্চল সম্বন্ধেও একটা সাধারণ ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। এ ভাষাঅঞ্চলটি বর্তমান অবিভক্ত সিলেট ছাড়াও আসামের অবিভক্ত কাছাড় অর্থাৎ কাছাড়-করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দি নিয়ে বরাক উপত্যকা নিয়েই এ ভাষাঅঞ্চল। এর মধ্যে আবার কাছাড়ের সিলেটি উপভাষার সঙ্গে সদর সিলেটের ভাষার কিছু পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্য মূলতঃ উচ্চারণগত। তবে বরাক উপত্যকার মানুষের মুখের ভাষা নিয়ে আসামের ‌উগ্র জাতীয়তাবাদী চক্র একটা ভিন্ন ধরনের চাল চালছিলেন। অসমিয়া ভাষার কিছু শব্দের সঙ্গে সিলেটি ভাষার শব্দগত, উচ্চারণগত সাদৃশ্যের ভিত্তিতে ওরা এ উপভাষাকে অসমিয়া ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, এবং এতে কাছাড়ের জনৈক সুসন্তান মন্ত্রী, এবং কতিপয় শিক্ষাবিদও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যদিও সেদিন ওই প্রয়াস সফল হয়নি, তবু ওদের ওই প্রকল্প এখনও পরিত্যক্ত হয়নি। এ অবস্থায় বরাক উপত্যকার বাঙালিরা সিলেটি ভাষা, অর্থাৎ উপভাষা নিয়ে অতি উৎসাহী হলে, এদের ভাষিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে সদা সচেষ্ট এক শ্রেণির অসমিয়া নেতৃত্ব একটা বিশেষ মওকা পেয়ে যেতে পারেন।


(৭)


এ তো গেল এপারের কথা, ওদিকে ওপারেও আছেন আরেক দল, যারা আবেগের আতিশয্যে বলেন সিলেটি একটি ভিন্ন জাতিসত্ত্বা, সিলেটি ভাষা একটি স্বতন্ত্র্য ভাষআ। এদের পেছনে কিছু সন্দেহজনক চক্রও সক্রিয় রয়েছে। ইংল্যন্ড-ভিত্তিক কিছু মতান্ধরা আবার একই সঙ্গে মধ্যযুগে সিলেটের নিজস্ব একটা লিপি, ‘সিলেটি নাগরি’ লিপির প্রসঙ্গ টেনে এনে সিলেটি স্বাতন্ত্র্যের পক্ষে যুক্তি খাড়া করতেও প্রয়াস করেছেন। তবে এ প্রসঙ্গ স্বতন্ত্র্য পরিসর এবং বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে। আপাতত বিষরটি এখানে উল্লিখিত থাক এ জন্য যে, যারা উপভাষা-ভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাধারাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন এদের শুধু জানিয়ে রাখা যে আমরা এ দিকে সচেতন, যদিও আপাতত এ অনুশীলনে গিয়ে পাঠকদের শিরঃপীড়ার কারণ হবার ইচ্ছা আমার নেই।


(৮)


সিলেটি ভাষা নিয়ে কোনো আলোচনা সম্পূর্ণ হবে না যদি এ ভাষার কিছু নমুনা পেশ করা না হয়। কিন্তু, কাজটি সময় সাপেক্ষ, পরিশ্রম সাপেক্ষ, এবং বর্তমান লেখকের সাধ্যের অতীত। ইতিমধ্যে সিলেট মদনমোহন কলেজের প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ প্রণব সিংহ, বরাক উপত্যকার জন্মজিৎ রায়, আবুল হোসেন মজুমদার, ঊষারঞ্জন ভট্টাচার্য কিছু কাজ করেছেন, একটি সম্পূর্ণ অভিধান, বলা চলে কোষগ্রন্থই রচনা করেছেন জগন্নাথ চক্রবর্তী, আর আবিদরাজা মজুমদারের আরেকটি অভিধানও প্রকাশের পথে। বর্তমান লেখকের এ দিকে মোটেই কোনো বিশেষ পাঠ বা অনুধ্যানই নেই। পাছে পাঠকরা নিরাশ হন তাই অতি সংক্ষেপে কিছু নমুনা পেশ করি।


সিলেটি ভাষার (এখানে ভাষা মানে উপভাষাই) চরিত্র লক্ষণ ধরা পড়ে এর উচ্চারণে। তাই ব্যাকরণের পদ্ধতি মেনে কয়েকটি উদাহরণ দিই।


ক. স্পৃষ্টধ্বনি (stop/plosive):


যে কুআড়ং (বিপজ্জনক) পত (রাস্তা), কিগুএ কইব শিলচর এগু টাউন। আড্ডির জুড়া খআইয়া (খসিয়ে) আইসি। ইচ্ছা করে এ মন্ত্রী চুর ইতার গগা (নলি) টিপিয়া ধরতাম।
— অর্থাৎ, যে বিপজ্জনক রাস্তা, কে বলবে শিলচর একটা টাউন। হাড়ের জোড়া খসিয়ে এসেছি। ইচ্ছে করে চোর মন্ত্রীর গলার নলি চেপে ধরি।


খ. উষ্ম ব্যাঞ্জন ধ্বনি (spiral):


শাইর করিয়া বেটাবেটি দারাইছইন। অর্থাৎ সার বঁেধে পুরুষ নারীরা দাঁড়িয়েছেন।


গ. শ্বাসাঘাত (stress):


ইগু একেবারে আউআ (বোকা)। ঘর আউআ (উদোম) করি আগাত (হাগতে) গেছে। জব্বর আলিআও ই বেটা। আর ডুলা গফ মারাত এক নম্বর। তার মউআয়ও (মেশো) ই কতা কইছইন। অর্থাৎ, ও একেবারে বোকা। ঘর উদোম রেখে হাগতে গেছে। বড় অলসও এ বেটা। মিথ্যা কথা বলতে ও ওস্তাদ। তার মেশোই এ কথা বলেছেন।


ঘ. দ্বিত্ব ব্যঞ্জন ধ্বনি:


ছাততা (ছাতা) মাথাত দিয়া তাইন আইছইন। তা ন তো পাক্্কার ঘর বাড়ি। কিন্তু বেটা ছাত একেবারে বাটটি


ঙ. ধ্বনি লোপ:


আমার গত্্রো এবো জুর আছে। অর্থাৎ, আমার গায়ে এখনও জোর আছে।


চ. অপিনিহিতি:


রাইক্ষসে (রাক্ষসে) দরছে তারে। মেউকরর (মেকুরের) মতো চায় দেখ না। কাইল (কাল) হারা রাইত (রাত) গাইল (গালি) গাইল্যাইছে (গালি দিয়েছে)। অর্থাৎ, ওকে রাক্ষসে ধরেছে। বেড়ালের মতো চাহনি। কাল সারা রাত গালাগালি করেছে।


ছ. হকারী ভবন:


হে তার হালির লগে পেম করে। অর্থাৎ, সে তার শ্যালিকার সঙ্গে প্রেম করছে।


জ. শিস্্ ধ্বনির বিলোপন:


গোরুয়ে ঘা খাইন না। অর্থাৎ, গরু ঘাস খাচ্ছে না।
পুলিশে লাগাল পাইলে বা হারাইব। অর্থাৎ, পুলিশে ধরলে বাঁশ দেবে।


এ তো গেল ধ্বনি ও উচ্চারণের দিক। ঔপভাষিক অঞ্চলের মানুষ বিশেষণ না লাগিয়ে কথা বলতে পারেনা। সিলেটি বিশেষণের ভান্ডার অফুরন্ত। এ বিশেষণে আবার আরবি-ফার্সি শব্দের বাহুল্যও দেখা যায়।


উদাহরণ:


খন্নাস (দজ্জাল) পুড়ির বাফও বড় খবিচ (দুষ্ট)। আর লগে আছে তাইর পিছলা (ছ্যাচোর) বাই। হালা টিফরা (ঝিমানো অভ্যাস যার) যে জাত খারুয়া (অসাবধানী)। আমি দিছলাম তারে আমার ছাততি। বাঙ্গিয়া ফিরৎ দিছে বেটা ধাউড় (ঠগ)।


অর্থাৎ, এ দজ্জাল মেয়ের বাপও দুষ্ট। আর সঙ্গে আছে তার ছ্যাচোর ভাই। শালা অলস যে কীরকম অসাবধানী, আমি দিয়েছিলাম আমার ছাতা। ফেরৎ দিয়েছে ভেঙে। এক নম্বরের ঠগ বেটা।


সিলেটি নির্দেশক সর্বনাম তো জগৎ বিখ্যাত। ইগু, ওগু, হগু ছাড়াও আবার আছে possessive case এ আমারগু, তুমারগু, তারগু; প্রশ্নবোধক কিগু, কুনগু, কয়গু।


বাংলা শব্দভান্ডারে আরবি-ফার্সি শব্দঋণের অধিকাংশই সিলেট এবং গ্রাম কাছাড়ে আকছার ব্যবহৃত হয়।


খুল্লম খুল্লা অই যাউক গিয়া আসলি আসামি কিগু।হে ফকির বেটা হারা দিন আল্লার কথা বাবে। তার মোকাম কে আয় কে জায় কে সুমার রাখত? তুমরার তো ইমান নাই, নমাজিও অইতায় যদি বুজলায়নে, আল্লার বান্দার লগে কাজিয়া ফয়রাদ ইসলাম গুনা। [অর্থাৎ, পরিষ্কার হয়ে যাক আসল আসামীটা কে। সে ফকির ব্যাটা সারা দিন আল্লার কথা ভাবে। তার ঘরে কে আসে কে যায় এসব কে হিসাব রাখবে? তোমাদের তো সততা নেই, যদি নমাজটাও করতে তবে বুঝতে ঈশ্বরের দাস হয়ে ঝগড়া কাজিয়া করাটা গুনাহ্্।]


গ্রাম কাছাড়ের মুসলিমরা অবলীলাক্রমে এরকম কথা বলে যে ভাষায় আরবি শব্দগুলো যেমনখুশি আসে যায়।


ফার্সি শব্দে ঠাসা একটা বাক্য দিই–


দোস্ত, যেজাত নাস্তানাবুদ অইছি আন্দাজ করতে পারতায় না। ইতা যে কার কারদানি জানি না। গেছলাম খুশমিজাজে ঈদর পোষাক খরিদ করতাম করি, ভাবলাম থুরা গোস্ত লইয়া যাই। দোকানর দরজার সামনে দাড়াইতেউ তার শাগরিদ বেশরম বেটায় কয় আইছইন পথর বাদসা বিনপয়সার খরিদ্দার, খরচ লইতা। কী জাত কতা রে বাবা। এর একটা হেস্তনেস্ত করতে অইব। [বুঝলে বন্ধু, কী রকম নাস্তানাবুদ হয়েছি কল্পনা করতে পারবে না। … দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছি আর ওর নির্লজ্জ চ্যালা বলে, এসে গেছেন রাস্তার বাদশা, বিনে পয়সার খরিদ্দার, জিনিস কিনবেন। কী ধরনের কথাবার্তা রে বাবা! এর একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে।]


ইংরেজি শব্দ সিলেটি তদ্ভব রূপে কী হয়েছে দেখবেন?


লজেন্স হয়েছে লেবেঞ্চুস, এ শব্দের মধ্যে লজেন্সের স্বাদও ধরা পড়েছে, কী করে খেতে হয় (চুষে চুষে), তাও শব্দের মধ্যে নিহিত। গার্জিয়ান = গার্জেন্ট; মিলিটারি = মেলেটারি; ব্যারিস্টার = বালেস্টর; ডিউটি = ডিবটি; পকেট = পেকেট; গ্যাসট্রিক = গেসটিং; প্রেসার = পেসার; পেনসন = পেনসিল (ইংরেজ অধিগ্রহণের পর কাছাড়ের ডিমাসা রানীর পেনশনের যে কাগজ কোম্পানি দপ্তর থেকে ইস্যু হয়েছিল, এর একটি কপি এ লেখকের দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। অতি নিশ্চিত কোন সিলেটি করণিকের বদান্যতায়ই মুদ্রিত ওই কাগজটির শিরোনামায় লেখা রয়েছে– ‘মহারণী ইন্দুপ্রভার পেনসিলের ফারম’)


কিছু ইংরেজি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ এসেছে এই সিলেটি ভাষার মধ্য দিয়ে, বর্তমানে আলোচ্য শব্দটি অবশ্য মেন স্ট্রিম বাংলায় স্থান পায়নি। ষাটের দশকে কাছাড়ে ছেলেরা রেডিও (আসলে ট্রানজিসটর) বগলে নিয়ে ঘুরত, রক্ষণশীলদের এটা ছিল নাপসন্দ, তাই রেডিওকে বলত বগলী। ইন্দিরা কেবিনেটের কৃষিমন্ত্রী ময়ীনূল হক চৌধুরী এক জনসভায় বলেছিলেন– ‘আইজ কাইলর ছুকরাইন হকলর তো কুন কামই নাই। ঘুম তাকি উঠিয়া বগলী লইয়া তারার সড়কো আটা আরম্ভ।’ অর্থাৎ, আজকালের ছেলেদের কোন কাজই নেই। ঘুম থেকে উঠে রেডিও নিয়ে শুরু হয় ওদের সড়কে পরিক্রমা।


এই ‘সড়কো আটা’ অর্থাৎ সড়কে হাঁটা শব্দগুচ্ছটি কাছাড়ে বিশেষ দ্যোতনা ঘন। এটা হলো অপদার্থ, নিষ্কর্মাদের জীবনচর্যার পরিচয়জ্ঞাপক। আপনার ছেলে কী করে— এর উত্তরে হতাশ বাবাকে বলতে শোনা যায়– ‘সড়কো আটে’, মানে বুঝতেই পারছেন, কিছুই করে না।


(৯)


যে কোনো ঔপভাষিক অঞ্চলের মানুষের ভাষায় উপমা, আর প্রবাদ প্রবচনের ছড়াছড়ি। সিলেটি এবং কাছাড়ি মানুষ তো এ দিকে একেবারে বাক্্সিদ্ধ। এদের ডিটান, ভাঙানি, আর প্রবাদ সংগ্রহ করলে মোটা মোটা বই-ই হয়ে যাবে। দু একটি বইও বেরিয়েছে। এইখানে কয়েকটি নমুনা মাত্র দেওয়া হ’ল–


১. আইতে জাইতে পচার বাপ, আম পাকলে মৌয়া– অর্থাৎ এমনিতে আমাকে ডাকে পচার বাপ বলে, আর আমার কাছে কোনো প্রত্যাশা নিয়ে এলে বলে মেশো।
২. জমানারে ধরছে ভুতে, যুবা নারীয়ে চাটিত মুতে– অর্থাৎ সবকিছু উলট পালট হয়ে গেছে।
৩. চিনেনা ভুবির গুড়ি বিয়া করতে চায় মৌলবির পুড়ি– কোন কাজের নয়, আবার শখ আছে।
৪. আন্দুদুন্দু পলো বায়, আল্লায় দিলে মাছ পায়– বুড়বাকের মতো কাজ করা, ভাগ্যে থাকলে ফল হয় নয়তো বৃথা পরিশ্রম করে।
৫. চেংও উজাইন, ব্যাংও উজাইন, কৈয়া পুটি তাইনও উজাইন– সবার দেখাদেখি এগিয়ে যাওয়া।
৬. যার পড়ে গাই উড়ো (গরু কাদায় পড়েছে) তাইন ধরইন লেঞ্জো মুড় (লেজ আর মাথা)– যার বিপদ তিনিই সবচেয়ে বেশি সচেষ্ট।
৭. যাচতে জামাই খাইন না, খুজতে জামাই পাইন না– সাধাসাধি করা হল গ্রহণ করলেন না, এখন প্রার্থনা করেও পাচ্ছেন না।
৮. অবাগা যেবায় চায়, সাগর হুকাইয়া যায়– অভাগা যেদিকে চায়…
৯. জন জামাই বাইগনা তিন নয় আপনা
১০. হাই মরলো হাঞ্জা বেলা, কান্দি উঠল পতাবেলা– সময় মতো কোন প্রতিক্রিয়া নেই, অসময়ে তর্জন গর্জন।


(১০)


সিলেটি উপভাষা নিয়ে আরও কয়েকটি কথা বলার প্রয়োজন রয়ে গেছে। এ উপভাষা অঞ্চলটি কেবল মাত্র পূর্ববঙ্গের সিলেট জেলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রাচীন কাছাড়, অর্থাৎ করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দি এবং কাছাড় জেলা নিয়ে যে বর্তমান বরাক উপত্যকা, তা তো বটেই, সে সঙ্গে আসাম-ত্রিপুরা সীমান্ত অঞ্চল, এমনকী ধর্মনগর এবং সংলগ্ন অঞ্চল এবং আসামের নওগা, হোজাই, লঙ্কা, ডবকা অঞ্চল পর্যন্ত ছিল এ উপভাষার ব্যাপ্তি, আজও আছে। ঐতিহাসিক কাল থেকেই এ বিস্তৃত ভূমি নিয়েই সিলেটি উপভাষার ভূগোল। মধ্যযুগে বঙ্গদেশ বলতে যে অবিভক্ত ভৌগোলিক অঞ্চলকে বোঝাত, এর মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট তো ছিলই, অবিভক্ত কাছাড়ও ছিল। এ অঞ্চলটিকে বাঙালীর ইতিহাস প্রণেতা নীহাররঞ্জন রায় ‘গাঙ্গেয় সমভূমির উত্তরাংশ’ বলে অভিহিত করেছেন, এবং সামাজিক, ভাষিক, এবং ঐতিহ্যগত দিকে যে এ অঞ্চলটি বঙ্গীয় মূল জীবনধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এ অভিমতও তিনি ব্যক্ত করেছেন। যেহেতু এ উপভাষাটির ব্যাপ্তি রাজনৈতিক মানচিত্রের সীমারেখা লঙ্ঘন করেছে, তাই এ’কে কেবল সিলেটি না বলে শ্রীহট্ট-কাছাড়ের উপভাষা বলাই বোধ হয় সঙ্গত।


এ প্রসঙ্গে আরও ক’টি কথা সূত্রাকারে বলাও বিশেষ জরুরি মনে হচ্ছে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের গবেষক, গোলাম মুর্শিদ (বর্তমানে লন্ডনে প্রবাসী) ‘আঠারো শতকের গদ্য: ইতিহাস ও সংকলন’ বইতে এ যাবৎ চলে আসা একটি মতের ভ্রান্তি নির্দেশ করে বলেছেন যে, ‘বাংলা গদ্যের সূচনা হয়েছে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগেই’ (দেশ-২.৮.১০. সংখ্যায় এ প্রসঙ্গে সুভাষ ভট্টাচার্য কথাটি এ ভাবেই উপস্থাপন করেছেন)। গোলাম মুর্শিদ লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউস থেকে অনেকগুলো দলিল, চিঠিপত্র খুঁজে বের করেছেন যা থেকে খুব পরিষ্কার ধারণা করা যাচ্ছে যে, সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকেই ব্যবহারিক বাংলা গদ্যের আত্মপ্রকাশ হয়ে গেছে। ওই গ্রন্থ সমালোচনায় সুভাষ ভট্টাচার্য বলেছেন ইংরেজ শাসনের আগে মোগল শাসনাধীন এলাকার বাইরের অঞ্চলের, অর্থাৎ ‘…কোচবিহার, অসম ও ত্রিপুরার স্থানীয় ভাষাই ছিল চিঠিপত্রের মাধ্যম’। কথাটি যে ভীষণ খাঁটি এর প্রমাণ স্বরূপ ১৯৩৪ সালে উত্তর কাছাড়ে ডিমাসা রাজধানী মাইবং থেকে মহারাজা কীর্তিচন্দ্র সমতল কাছাড়ে যে নিয়োগপত্র প্রেরণ করেছিলেন, এখানে এর অংশ বিশেষ তুলে ধরা হ’ল। বিশেষ উল্লেখ্য, এ ভাষাটি হ’ল এরকম সরকারি দলিলে ব্যবহৃত একটি আঞ্চলিক বাংলা গদ্যের প্রাচীন নিদর্শন।


আর বড়খলার চান্দলস্করর বেটা
মনিরামরে আমি জানিআ কাচারির
নিঅমে উজির পাতিলাম এতে অখন–
অবধি তুমার উজিরর বেটা ও নাতিও–
পরিনাতি তার ধারাসূত্র ক্রমে এই উ–
জির হইআ জাইব ..
এতদর্শে অভয় দিলা ম-


এতে কুন শন্দেহ না আছে আর রা–
জ্যর মনুশ্য জে জন উজিরর বাক্যে–
না চলে মেল দেয়নে হেলা করিআ–
দেয়রঙ্গ করে .. তারে সর্ব্বদন্ড করিমু ..


তুমার আইল শিমা উ বিশএত যে হিংসা করে–
তার প্রাণ রৈক্ষা না করিমু আর আ–
মার বংশে তুমার বংশরে পালন–
করিব মহা ২ অপরাদ পাইলে ৭শা
ঠা খেমিআ উছিত দন্ড করি মু —

ইতি শক ১৬৫৮, ২৯ ভাদ্রশ্য


এই হলো অষ্টাদশ শতকের সিলেটি-কাছাড়ি উপভাষার নমুনাও।


(১১)


এবার দেওয়া হ’ল একটি সাম্প্রতিক সিলেটি উপভাষার গীতের নমুনা–


আমার এক কিনারায় শাহজালাল, আর কিনারায় নিমাইচান্দরে
নদীর নামটি সুরমা আমার সিলট জিলা নাম–
সুরমা নদীর তীরে আমার ঠিকানা
বাবা শাহজালালর দেশ সিলটভূমিরে।
আমার জনম সিলট মরণ সিলট সিলট জানর জান রে
বাবা শাহজালালর দেশ সিলটভূমিরে।।

আইছি সিলট, জাইমু সিলট, সিলট থাকমু শুইয়া
যে মাটিত ঘুমাই আছইন তিনশো ষাইট আউলিয়া
সিলট আমার, সিলট তুমার, সিলট জানর জান রে। বাবা শাহজালালর দেশ…

কান্দিয়া যে মাটিত ঘুমাইন হাসন রাজা
যার কান্দনে আইজ কান্দ রাইতর চন্দ্র তারা
কান্দে আরকুম শিতালং শা, কান্দে রাধারমণ রে
বাবা শাহজালালর দেশ, বাবা শাহ পরাণর দেশ, বাবা শ্রীচৈতন্যর দেশ
সিলট ভূমিরে।।


(১২)


একটা মেটাফিজিক্যাল কবিতা —


কাইল সারা রাইত
একবার ও কাইত আরবার হো কাইত
ঘুম আইল না তেব
আলপিন এগু ফুটি রইছে আমার বুকুর জেব।
আসলে ইগু আলপিন নায়
তুমার চেরা।


(লেখক অজ্ঞাত)

10 Responses to “প্রসঙ্গ সিলেটি ভাষা”

  1. “এ অবস্থায় বরাক উপত্যকার বাঙালিরা সিলেটি ভাষা, অর্থাৎ উপভাষা নিয়ে অতি উৎসাহী হলে, এদের ভাষিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে সদা সচেষ্ট এক শ্রেণির অসমিয়া নেতৃত্ব একটা বিশেষ মওকা পেয়ে যেতে পারেন।” এটা এক মারাত্মক ধারণা। এরি জন্যে আমি বহু আগে থেকে এই নিয়ে চর্চা করতে গিয়েও শিলচর বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসাহ পাইনি। কিন্তু স্বপ্নটাও ছাড়তে পারিনি। বরাকে এরই জন্যে আজঅব্দি তেমন কেউ বিদগ্ধ ভাষাবিদ গড়ে উঠলেন না। অথচ তার জন্যে ১৯শের এই জমি ছিল উর্বর। অথচ অসমিয়াদের মধ্যে কিন্তু এই নিয়ে চর্চা থেমে থাকে নি। অতি সাম্প্রতিক, উপেন রাভা হাকাচামও এই নিয়ে বেশ উৎসাহী। এবং তাঁর বইগুলোতে লিখেওছেন। একি অনেকটা নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গের মতো শোনায় না? অসমিয়াদের যারা , একে অসমিয়া বলতে চান, তাদের এই কথা বলে গেলেই ত হলো যে , কোনো একটা ভাষা বা উপভাষা কোনো নামে পরিচিত হবেন, সেটি ঠিক করবেন, সেই ভাষাগোষ্ঠির মানুষ । অন্যেরা নয়। একই কথা কিন্তু উত্তর বাংলা ও অসমের রাজবংশীদের বেলাও খাটে । আর এই দাবি তখন আরো জোরালো ভাবে একাডেমিক স্তরে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে যদি আমাদের নিজেদেরই ভালো বড়ো ভাষা তাত্বিক থাকেন। শুধু শুধু, অসমিয়া জুজ্রুর ভয় দেখিয়ে গেলে কোনো দিনই তো দুই গোষ্ঠির মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠবে না। সেই ঐক্যের প্রয়াস ওদের থেকে নেই বলে যদি ধরেও নিই, তবে আমাদের কি দায়িত্ব নেই? অসমিয়া আর সিলেটির মধ্য ঐতিহাসিক বহু মিলও আছে, সেটি সন্ধান করলে দুই ভাষাই উপকৃত হতে পারে। কে জানে এ ইতিহাসের কোনো নতুন সূত্রও বের করে আনতে পারে। সঞ্জীব দা পন্ডিত মানুষ, আমি তাঁর লেখা মন দিয়েই পড়ি। কিন্তু বরাকে এরকম কিছু ‘চিহ্ন প্রক্রিয়া’ কিছু বুদ্ধিজীবি মিলে তৈরি করছেন, যা আমার মতে আজ না হোক কাল প্রত্যাহ্বানের মুখে পড়বেই।
    আরেকটা কথা, সিলেটির তিন জেলাতে তিন রকম ফের আছে, আছে ধর্মনগরেও। আর আছে বাংলা দেশেও। এগুলো কি বিভাষা? আমি জগন্নাথ চক্রবর্তীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি বরাক বাংলা নাম দিয়ে অবিধান লিখেছেন কেন? সেটি কি সিলেটি? উনি কিন্তু বলেছেন, না। সেটি সেই উপভাষা যার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বরাকের বুদ্ধিজীবিরা স্বীকার করেন না। আমি যতদূর জানি সঞ্জীবদা নিজে কাছাড়ের সেই উপভাষা ( বা বিভাষাগোষ্ঠীর মানুষ) । স্থানীয় মানুষের কাছে এটি কাছাড়ি বাংলা বলে ছেলেবেলা থেকে শুনে এসছি। এর স্বাতন্ত্র্য আমরা স্বীকার করছি না কেন? সিলেটি আধিপত্য কায়েমের স্বার্থে, না অসমীয়া আধিপত্যের ভয়ে? এটি কিন্তু অস্বীকার করবার উপায় নেই, যে বরাকের শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কিন্তু মূলত সিলেটের থেকে এই সেদিন আসা সিলেটি রা, ( আমার পূর্ব প্রজন্মও তাই) । তাঁরা কি নিজেদের সুবিধে অনুযায়ী গ্র্যান্ড নেরেটিভ তৈরি করে নিচ্ছেন? সঞ্জীব দা কি, উপায় না পেয়ে তার কাছে আত্ম সমর্পণ করছেন? আমি নিশ্চিত নই, কারণ জগন্নাথের সুরে সুর মেলাবার লোক কিন্তু , এখনো বেশি নেই। সুতরাং আমি বা জগন্নাথ বললেই কিন্তু এই উপভাষা ‘সিলেটি না’ হয়ে যাচ্ছে না। আমি নেহাতই কৌতূহল বশতঃ প্রশ্নগুলো তুলললাম। অপ্রিয় যদিও। অপ্রিয় প্রশ্নই তো নতুন সন্ধানের দিকে ঠেলে দেয়, ঠিক কিনা?

  2. Rajib Kar said

    Oshadharon …..

  3. দেবর্ষি said

    ভাল লাগল। বিশেষ করে উদাহরণগুলো। সুশান্তবাবুর পোস্টের প্রথমাংশর সাথে একমত।

  4. ধন্যবাদ দেবর্ষি। প্রথমাংশ নিয়ে কাজ হলেইতো দ্বিতীয়াংশ নিয়ে স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে।

  5. Ajay said

    মিহির সেনগুপ্ত যেরকম ‘বিষাদবৃক্ষ’ লিখে বরিশালের ভাষাকে মান্যতা দিয়েছেন,সেরকম একটি সিলেটি সাহিত্যও দরকার কারণ কমাস আগে কলকাতায় এক ভদ্রলোক আমাকে বৌ এর সংগে ফোনে কথা শুনে বাংলাদেশী ঠাউরেছিলেন। যদিও ভদ্রলোক বাংলার শিক্ষক।

    লেখক একটি বিষয় মনে হয় উল্লেখ করেননি,যে সিলেটি একটু গ্রাম্যতা দোষে দুষ্ট,অশ্লীল শব্দের ব্যবহার একটু বেশী। এটা কি উপভাষা হওয়ার কারণে?

    কদিন আগে বাসে একটি ডিটান(প্রবাদ)শুনলাম,”ছিড়তায় পারনা মুরগির বাল আর নাম চটকাও শেখ দুলাল” অশ্লীলতা থাকলেও ‘অকম্মার ধাড়ি’ থেকে impact অনেক বেশী। কি বলেন বাঙালরা?

  6. ডিটান, সঞ্জীবের মতো অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও মনে করেন সিলেটি নিয়ে বেশি উৎসাহীত হোয়া উচিত নয়। তাই আপনি বলবার মতো সিলেটিতে লেখা সাহিত্য হচ্ছে না। চিত্রভানু ভৌমিকের একটি বিখ্যাত নাটক আছে ,”আইজও আন্ধাইর’ তার জন্যে তাঁকেও বেশ সমালোচিত হতে হয়েছিল। তবে কিনা বেশ কিছু নাটকে, গল্পে সিলেটি স্নগ্লাপ থাকেই। আপনি যে বাংলার শিক্ষকের কথা বললেন, তাঁড় ভ্রম সিলেটি সাহিত্য দূর করতে পারত, যদি আমাদের শিলচর, ধর্মনগরে নিজের প্রকাশনা গড়ে উঠত। আমাদের আদর্শ বাংলাতে লেখা ভালো ভালো লেখারই কলকাতা বা অন্যত্র কোনো বাজার নেই! পড়বে কে?

  7. আগের মন্তব্যে জয়ের জায়গাতে ডিটান কী করে লেখা হয়ে গেল, বুঝিনি। মুছেও ফেলতে পারছি না। তার জন্যে দুঃখিত।

  8. Sayantan Sarkar said

    Dekhe khub bhalo laglo je upobhasha nie sotyi sotyi lekha shuru hoye gyachhe. Udahoron gulor jonyo dhanyabad. Jara eta shuru korlen tader obhinondon.

  9. Monmajhi said

    সিলেটি নিয়ে বাংলাদেশের আসাদ্দর আলী বেশ কিছু কাজ করেছেন। এই লিঙ্কটা দেখতে পারেনঃ http://www.faridahmedreza.co.uk/articles/?articleLang=b&articleNum=40

    আর হ্যাঁ, সঞ্জীব মান-উপভাষার সম্পর্ক নিয়ে যে বাতিল গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের বা তত্বের পুনরাবৃত্তি ক্রলেন, তা বহু আগেই ভুষিমাল হিসাবে প্রমানিত।

    নদীয়া শান্তিপুরের যে তথাকথিত মানভাষার কথা সঞ্জীব উল্লেখ করলেন, সে [b]উপ[/b]ভাষাটা আসলে একটা ‘ডায়ালেক্ট কন্টিনিয়াম’-এর এক প্রান্তের একটি উপভাষা বা বৃহত্তর ভাষা-পরিবারের একটি সদস্য মাত্র, তার বেশি কিছু নয়। আর সিলেটি ঐ ‘কন্টিনিয়ামের’ একদম অন্য প্রান্তের বা মাথার আরেকটি ভাষা – যে প্রান্তে বা মাথায় পৌঁছে সিলেটি আর কোন উপ-টুপ নেই — পুরোদস্তুর একটা ভাষাই। কন্টিনিয়ামের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তবর্তী ভাষাগুলি ভিন্নই হয়, এক্ষেত্রেও তাই। এর উপত্ব কারো কারো মনে স্রেফ কাল্পনিক হীনমন্যতাজাত, ঐ কাল্পনিক হীনমন্যতার বাইরে এর আর কোন উপত্ব নেই। ধন্যবাদ।

    মনমাঝি
    বাংলাদেশ

  10. মন মাঝির মন্তব্য থেকে একটা নতুন ভাবনা পেলাম। কিন্তু আপনি যতটা আক্রমণাত্মক ততটা সাবলীল নন।”তা বহু আগেই ভুষিমাল হিসাবে প্রমানিত।” –সেরকম হলে আনন্দের কথা। কিন্তু কবে কীভাবে প্রমাণিত বোঝালেন না। আর ওই যে “তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন চর্যাপদের কবিগণ সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন।” এমন প্রমাণ সব ভাষা উপভাষার লোকেরা করেন। আমাদের বরাকেও দু একজন আছেন যারা দাবি করেন এমনটি। অসমিয়ারা দাবি করেন ওরা সবাই ব্রহ্মপুত্র পারের ছিলেন। এগুলো একজন লিখলেই মানা যাবে না।”আসদ্দর আলী সাহেব গবেষণা করে দেখিয়েছেন চর্যাপদের তিন শ’র মতো শব্দ হলো সিলেটী শব্দ”–এমনটা হতেই পারে। কে মানা করতে যাচ্ছে? আরো তিনশটা ঢাকার শব্দ বলেও দেখানো যেতে পারে। অসমিয়ারা সব ক’টাকে অসমিয়া বলে দেখিয়ে দেবেন। আপনার দেয়া লিঙ্কের লেখককেও বেশ উদ্ধত মনে হলো। তবে আসাদ্দর আলী সম্পর্কে আরো জানার ইচ্ছে রইল। এবারে করিমগঞ্জে বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে এসছিলেন, নন্দলাল শর্মা । তাঁর মুখেও আসাদ্দর আলী সম্পর্কে এমনটি শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: