বা ঙা ল না মা

তেভাগার নারী এবং ইলা মিত্র

Posted by bangalnama on June 1, 2010


তেভাগা আন্দোলন শুরু হচ্ছে স্বাধীনতা আসার আগের সেই আলো-আঁধারি মুহূর্তে, যখন একদিকে নৌ-বিদ্রোহ হচ্ছে, ডাক-তার ধর্মঘট হচ্ছে , নানান জায়গায় বিক্ষোভ ফেটে পড়ছে; আর এরই মাঝে কোথাও একদিকে স্বাধীনতা আসব আসব করছে। সেই সময়ে যাদের নেতৃত্বে মূলতঃ স্বাধীনতা এল, সেই কংগ্রেস পার্টির চরিত্র এই আন্দোলন একদিকে উন্মুক্ত করে দিল, আর, যে স্বাধীনতা আসতে চলেছে সে স্বাধীনতার চরিত্রও যেন নিজের অজান্তেই স্পষ্ট করে দিল। আজ আমরা যখন আবার তেভাগাকে ফিরে দেখার চেষ্টা করছি, তখন যে জিনিসগুলো আমাদের সামনে এক অর্থে প্রশ্ন এবং একই সাথে উত্তর হয়ে আসে, সেগুলোর মধ্যে একটা অবশ্যই যে, একদম অন্ত্যজ শ্রেণীর আদিবাসী নারীরা (যাদের আমরা এখন শিডিউলড ট্রাইব বলি) আন্দোলনের সামনের সারিতে চলে আসছেন প্রথমবার। এই আন্দোলন শুধুমাত্র গ্রামীণ অর্থনৈতিক বুনিয়াদে ধাক্কা দিয়েছিল তা নয়, এই আন্দোলন যে নারী এবং পুরুষের সম্পর্কের ‘প্রচলিত’ গঠনবিন্যাসেও একটা নাড়া দিয়ে গিয়েছিল, সেটাও এর ইতিহাস আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে যায়।


উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি থেকে শুরু করে দক্ষিণে কাকদ্বীপ, পশ্চিমের নন্দীগ্রাম অবধি ছড়িয়ে পড়েছিল তেভাগার লড়াই। সব জায়গায় নারীরা নানান ভাবে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। এই আন্দোলনে নারীরা প্রথম কীভাবে আসলেন তার সাথে, ইলা মিত্রের আন্দোলনের নেতৃত্বে উঠে আসার যে ট্রাজেক্টরি, তার কোথাও একটা মিল আছে। ১৯৪২-এর পর যখন কম্যুনিস্ট পার্টি ঠিক করল যে তারা, বিশেষতঃ গ্রামাঞ্চলে, ফ্রন্ট সংগঠন গড়ে তোলার কাজ করবে, তারা কিন্তু প্রথমে তেভাগার কথা ভাবেনি। তারা তখন ভাবছেন অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ফ্রন্ট করবেন। সেই সময় তারা নারী রক্ষী বাহিনী গড়ার কথা ভাবলেন। এবং আমরা দেখি, কলকাতায় সেই সময় ইলা মিত্র মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিতে যোগ দিচ্ছেন। এই সমিতি মূলতঃ নানারকম মিছিল করত; তার সাথে তারা গ্রামের মহিলাদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের কাজ করত, এবং সেই সঙ্গে ইকোনমিক প্রসেস বা অর্থনৈতিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর। এইটা মাথায় রাখলে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, ইলা মিত্র যখন শ্বশুরবাড়িতে গেলেন তখন কেন সবার আগে স্কুলটি খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর সেই কাজটা আসলে কম্যুনিস্ট পার্টির সেইসময়কার কাজের ধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

নারী ও শিশু। শিল্পী ঃ সোমনাথ হোর। ২৫শে ডিসেম্বর ১৯৪৬। Tebhaga: An Artist's Diary and Sketchbook.


এইসময়ে যখন গ্রামেগঞ্জে মহিলা সমিতি গড়ে উঠছে, যাঁরা শিক্ষাবিস্তারের কথা ভাবছেন, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কাজকর্মে মহিলাদের টেনে আনার কথা ভাবছেন, তাঁরা আসলে কারা ছিলেন? তেভাগা শুরু হওয়ার আগে অবধি খেটে খাওয়া মহিলাদের হাতে সমিতিতে অংশ নেওয়ার জন্য সময় ছিল বড়ই কম। তাঁরা বড়জোর সন্ধ্যেবেলা দিনের কাজ ফুরোবার পর আর বাড়ির কাজ শুরু হওয়ার আগের সময়টুকু ছাড়া, সান্ধ্য বৈঠক ছাড়া যোগ দিতে পারতেন না কোনোরকম রাজনৈতিক কাজকর্মে। তাই স্বাভাবিকভাবে মহিলা সমিতির নেত্রীস্থানীয়দের মধ্যে উঠে এসেছিলেন অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারের বধূরা। এবং স্বাভাবিকভাবেই যেখানে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রভাব পড়েছিল, অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক সূত্রে তাঁরা এই মহিলাসমিতির নেতৃত্বের জায়গাটায় চলে এসেছিলেন।


এরপর যখনই তেভাগার লড়াই শুরু হল, দেখা গেল, এতদিন যাঁরা পিছিয়ে ছিলেন সেই প্রান্তিক অংশটা এবারে উঠে আসছেন। যখন আমরা ইতিহাসের অংশ হিসেবে ইলা মিত্রকে দেখতে চাই তখন কোথাও তাঁর গতিপথও ওই বিন্দুতে মিলে যায়। কারণ উনিও শুরু করছেন একটি সচ্ছল ঘরের বধূ হিসেবে, যিনি কলকাতা থেকে গাঁয়ে যাচ্ছেন, এবং প্রথমটায় মহিলা সমিতির যে নির্ধারিত কর্মসূচী (শিক্ষাবিস্তার), তার মধ্যেই নিজের কাজ আবদ্ধ রাখছেন। এবং তারপর শুরু হচ্ছে তেভাগা। তেভাগা যখন শুরু হচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই যে কারণে অন্ত্যজ মহিলারা, সঁাওতাল মহিলারা রাজনৈতিক কাজকর্মে উঠে আসতে পারছিলেন না, সেই বাধাটা কেটে যাচ্ছে। তেভাগার দাবী সম্পূর্ণরূপে অর্থনৈতিক এবং কৃষিজ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় প্রান্তিক নারীদের কাছে অধিকারের লড়াই হিসেবে প্রবল ভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সারা বাংলা জুড়ে যেখানে যেখানে তেভাগা হয়েছে, এই শ্রেণী থেকে উঠে আসা নারীরা একটা জঙ্গি ভূমিকা রেখেছেন। পুরুষের ভূমিকার নিরিখে নারী আন্দোলনকারীদের এই চরম আগ্রাসী মনোভাবের কারণ হিসেবে তাদের অর্থনৈতিক ও যৌন নিপীড়ন – এই যুগ্ম শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নিহিত আছে, এমনটা মনে করা হয়। তারা যেরকম ফ্ল্যাগ পুঁতে ধান দখল করেছেন, তেমন নারী বাহিনী গঠন করেছেন গ্রাম পাহারা দিতে। তারা দা-গাঁইতি নিয়ে সেই পাহারার কাজ করেছেন। এবং এই সময়েই অহল্যা মার মত অনেক নারী শহীদ হয়েছেন। এটা ইতিহাসবিদদের কাছে একটা চিত্তাকর্ষক বিষয় হতে পারে যে যারা তেভাগার শহীদ হয়েছেন তার একটা বড় অংশ মহিলা। প্রথমদিকে যখন মহিলারা তেভাগায় আসেননি, সেইসময় মহিলাদের মূল কাজ ছিল বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা, তখনও দেখা গেছে যে অদ্ভুত সাহস ছিল। অমিত বীরত্বের পরিচয় তারা দিয়েছেন।


এত গেল একটা দিক। লালগঞ্জের কথা যদি দেখি, যেখানে তিনজন মহিলাকে খুন করা হচ্ছে, বা অহল্যার কথা যদি দেখি যেখানে অন্তঃস্বত্ত্বা অবস্থায় তিনি লড়ছেন এবং তাঁকে হত্যা করা হচ্ছে, এই ঘটনাগুলোতেই, যাঁরা পিছিয়ে ছিলেন, সেই অর্থে ইতিহাস বইতে যাদের নাম দেখিনা, তাঁরা এগিয়ে এলেন। আর এই সমস্ত পরিঘটনার – একদিকে নেতৃত্বে উঠে আসা, আরেকদিকে এই নারীদের সঙ্গে যা যা হয়েছে – এই সমস্তটার ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে যেন ইলা মিত্রের কম্যুনিস্ট পার্টিতে ভূমিকা এবং সামগ্রিক ভাবে তেভাগাতে ভূমিকা আমরা দেখতে পাই। তেভাগা আন্দোলনের জোয়ারে অন্তঃপুর থেকে বেরিয়ে আসা তাঁর পক্ষে সহজ হচ্ছে, তিনি মিশে যাচ্ছেন একদম সাধারণ মানুষের মধ্যে। মিশে যাচ্ছেন সাঁওতাল সেজে, তাদের ভাষা বলছেন। যখন ধরা পড়ছেন তখনও তিনি সাঁওতাল সেজে আসছেন। অকথ্য পুলিশি অত্যাচারের মুখে দাঁড়িয়ে সাহসের সাক্ষর রাখছেন।


আরেকটি যে প্রশ্ন তেভাগার প্রেক্ষিতে ফিরে আসে- যখন লড়াইটা শুরু হয়েছিল, তখন লড়াইয়ের শুরুতে নেতৃত্ব দেওয়ার একটা সচেতন প্রচেষ্টা পার্টির মধ্যে দেখা যায়। কিন্তু যখন আন্দোলনটা ভেঙে যাচ্ছে, তখন নেতৃত্বের মধ্যে স্পস্ট দ্বিধাগ্রস্ততা এবং যেখানে নির্দিষ্ট দিশা দেওয়ার প্রশ্ন ছিল সেক্ষেত্রে গুরুতর ত্রুটি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। নাচোলের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে সেখানকার নারীরা লড়াইয়ের জমি ছেড়ে দিতে চাননি, অদ্ভুত জঙ্গি আন্দোলন করেছেন। আমরা এখানেও দেখি, যখন ৪৮ সালে রণদিভে লাইন জিতছে , এবং সারা বাংলা জুড়েই আস্তে আস্তে তেভাগার উত্তাপ স্তিমিত হয়ে আসছে, নাচোলের লড়াই তখনও চলছে। কিন্তু একবার যখন পুলিশের ওপর গ্রামের দরিদ্র মানুষদের আক্রমণ সশস্ত্র রূপ নিচ্ছে, এবং তার ওপর যখন পুলিশের অত্যাচার ভীষণ আকারে নেমে আসছে তখন আমরা দেখতে পাচ্ছি যে পার্টিনেতৃত্বের সবাই কেউ ভারতে চলে যাচ্ছেন বা কেউ সরে আসছেন। কেন্দ্রীয় স্তর থেকেও কোনো দিশা দেবার চেষ্টা নেই। এই যে বিশাল অংশের মানুষরা লড়াই করেছিলেন, তাদের লড়াইকে কোনদিকে নিয়ে যাওয়া হবে সেই নিয়ে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।


এই যে পুরো তেভাগা, ভালো মন্দ মিলিয়ে তেভাগা, একদিকে যেমন বিশাল আশা জাগাচ্ছে মানুষের মনে- শুধুমাত্র অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে না, একটা গোটা প্রজন্মের চিন্তার পরিবর্তন ঘটিয়ে দিচ্ছে- এবং আমরা চাই বা না চাই, আমাদের গ্রামীণ ক্ষেত্রেও নারী পুরুষের অবস্থানগত সম্পর্ক খানিকটা বদলে দিচ্ছে, আবার সেই তারই অনিবার্য ব্যর্থতা – এই সমস্ত মিলিয়েই মনে হয় আমরা ইলা মিত্রকেও দেখতে পারি। কোনো ব্যক্তি বীর হিসেবে নয়, বা জনতার থেকে এগিয়ে যাওয়া মানুষ হিসেবে নয়, তেভাগা তার উচ্ছ্বাস এবং হতাশা যে একই সাথে বহন করে, তারই এক উদাহরণ হিসেবে।


সূত্র ঃ অমিত কুমার গুপ্ত, Social Scientist. v 8, no. 88 (Nov 1979) p. 73.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: