বা ঙা ল না মা

তেভাগার আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা

Posted by bangalnama on June 1, 2010


লিখেছেন অন্বেষা ভট্টাচার্য


“তেভাগা” শব্দটি উচ্চারিত হলেই খুব ছোট থেকে আমার মনে যে নামটি ঝিলিক দেয় তা হলো “অহল্যা”। না উনি ইলা মিত্র বা মণিকুন্তলা সেনের মত বড়ো নেত্রী নন। সাধারণ কৃষক বধূ। হ্যাঁ, তেভাগা আন্দোলনে এই কৃষক ঘরের মেয়েদের অবদানটা ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে কোনো কোনো অঞ্চলে আন্দোলনকে মেয়েরাই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তারা কাস্তে আর লাঠি হাতে মিছিলে হেঁটে পুরুষ কৃষকদের জড়তাকে দূর করেছিল। আবার অন্যদিকে তেভাগা আন্দোলনেই প্রথম কৃষক গৃহবধুরা পথে নামে, এই আন্দোলন কিছুটা হলেও পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ওপর আঘাত আনে। এসবের প্রমাণ আমরা বারবার পাই ভবানী সেন, রানী দাশগুপ্ত, কৃষ্ণবিনোদ রায় বা অন্যান্যদের লেখায়।


দেশ-কাল নির্বিশেষে দরিদ্র মেয়েরা দ্বিমুখী শোষণের শিকার। এক, দরিদ্র বলে; দুই, মেয়ে বলে। প্রাক্-তেভাগা যুগে গ্রাম বাঙলার কৃষক মেয়েদের ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি। তাদের না ছিল কোনো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না ছিল কোনো সামাজিক অধিকার। কিন্তু ঘরে এবং ক্ষেতে এরা নিঙড়ে দিত নিজেদের ক্ষমতার সমস্ত নির্যাস। এর ওপর ছিল জোতদারদের বাড়ি বেগার খাটার জুলুম, যৌন নিগ্রহ। ফরিদপুরের এক কৃষক বালিকা কৃষ্ণা মালু জোতদারদের বাড়ি যেতে অস্বীকার করে; তাদের পরিবারের ওপর নেমে আসে নানাবিধ অত্যাচার। এক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির স্থানীয় কর্মীরা তাদের পাশে ছিলেন। চিত্রটা কোথাও কোথাও ছিল আরো ভয়াবহ। দরিদ্র কৃষক মেয়েদের বিয়ে করত জোতদারেরা – এক বেলা খেতে দিয়ে পেয়ে যেত ধান ঝাড়ানোর বাঁদী এবং রাতে ধর্ষণের অধিকার।


১৯৪৩-এর মন্বন্তর একার্থে মহিলাদের ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করে। লঙ্গরখানা গুলিতে ছিল নারী ও শিশুদের ভিড়। স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় (পেটের দায়ে বা পাচার হয়ে) বেশ কিছু দরিদ্র মেয়ে বেশ্যাবৃত্তিকে জীবিকা হিসেবে বেছে নিতে থাকে। দুর্ভিক্ষের পরে পরেই দেখা দেয় বস্ত্র সংকট। এই সমস্ত সংকটের শিকার মেয়েরা সংঘবদ্ধ হতে থাকে। এই সময়েই মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গঠিত হয়।


রানী দাশগুপ্ত এক জায়গায় লিখেছেন “কৃষক-মেয়েরা লড়াই করেই পার্টি এবং কৃষক সমিতিতে যোগ্য স্থান করে নিয়েছিলেন।” দীপশ্বরী, সরলা (যশোর) বিমলা মাজী (মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম) -দের দুর্ধর্ষ নেতৃত্বের পরিচয় আমরা তাঁর লেখাতে পাই। প্রত্যেক গ্রামে সংগ্রাম কমিটির দু’টো শাখা ছিল- কৃষক যুবকদের ভলান্টিয়ার বাহিনী ও নারী বাহিনী। ধান কেটে পঞ্চায়েত খামারে তোলার সময়ে ভূপাল পান্ডার নেতৃত্বাধীন দল পুলিশের কাছে পরাস্ত হয়। এর ফলে জোতদার ও পুলিশের মনোবল বেড়ে গিয়েছিল। “কিন্তু কমরেড বিমলা মাজীর নেতৃত্বে জঙ্গী কৃষক নারী বাহিনী দা, বঁটি ও ঝাঁটাসহ কোঁচড়ে ধুলোর সঙ্গে লঙ্কা নুন নিয়ে প্রতিরোধে এগিয়ে যায়।” শেষ অবধি পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল এবং এই ঘটনা ও রণকৌশল জেলার অন্যান্য জায়গাতেও প্রভাব ফেলে। রাণীশঙ্কাইল থানায়, চিরিরবন্দরে, ময়মনসিংহের তেভাগা ও টংক আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।


নারী বাহিনী গঠিত হয়েছিল প্রধানতঃ কৃষক ঘরের মেয়েদের নিয়ে। তেভাগার তৃতীয় পর্যায়ে কম্যুনিস্ট পার্টি ও কিষাণ সভা যখন দুর্বল হয়ে পড়েছে তখন খুব স্বাভাবিক কারণেই নারী বাহিনীর উত্থান হয়। দিনাজপুর, যশোর এবং ২৪ পরগনায় নারীবাহিনী ছিল বেশ শক্তিশালী । যশোরের নড়াইল মহকুমায় ৫০০ মহিলা খাদ্য-বস্ত্রের দাবি নিয়ে মিছিলে হেঁটেছিলেন । যশোরের এই নারী বাহিনী গঠিত হয়েছিল প্রাদেশিক বা স্থানীয় পার্টি নেতৃত্বের কোনো রকম প্রচেষ্টা ব্যতিরেকে। যেহেতু এটা শুধু সর্বহারা মেয়েদেরই দল তাই নারীর আন্দোলনের উর্দ্ধে উঠে সমগ্র শ্রেণীর আন্দোলনকে ধারণ করেছিল।


১৯৪৯-এ হাওড়া হুগলীতে তেভাগার লড়াই শুরু হয়। সেখানেও নারী বাহিনী পিছিয়ে থাকেনা। তারা কখনো দিয়েছেন ধান পাহারা, কখনো দিয়েছেন গুপ্তসভা পাহারা। ৯-ই সেপ্টেম্বর সাঁকরাইলের হাটাল গ্রামে ভরদুপুরে পুলিশী প্রহরায় জমিদারের বাহিনী ধান কেটে নিয়ে গেলে মেয়েরা শাঁখ বাজিয়ে শত্রুর এই আগমন বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দেয়। পুলিশের সাথে সংঘর্ষেও নেমে যায় তারা। পুলিশ গুলি চালান। বীরাঙ্গনার মত লড়ে গুলি খান চোদ্দ বছরের কিশোরী বধূ মনোরমা। নিহত হন সাধুবালা, যশোদাময়ী ও আরো ছ’জন মহিলা। ১৯শে ফেব্রুয়ারী। এটা হুগলি জেলার ডুবির ভেরী। সন্ধ্যা বেলায় পুলিশি হামলা। মেয়েরা বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে সেই হামলাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। গুলি চালানো তো পুলিশের আইনসিদ্ধ অধিকার; শহীদ হন সাত জন মহিলা। যাদের অনেকরেই নাম নেই বইয়ের পাতায়, পরিচয় লেখা আছে কারো মা হিসেবে। নিজের নামে পরিচিত হতে পারেননি যারা, কারো মেয়ে, কারো স্ত্রী, কারো মায়েরা সেদিন নড়িয়ে দিয়েছিলেন জমিদারী তন্ত্রের ভিত।


এবার একটু চোখ ফেরাই ২৪ পরগণার দক্ষিণে (আজ যা দক্ষিণ ২৪ পরগণা)। ১৯৪৬-৪৭-এ তেভাগার আন্দোলন এইখানেই সবচেয়ে তীব্র রূপ ধারণ করেছিল। লালগঞ্জ, চন্দনপিঁড়ি – কাকদ্বীপের আশেপাশের অঞ্চলগুলিতে বেজে উঠেছিল যুদ্ধের দামামা। চন্দনপিঁড়িতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়ে ছিলেন গর্ভবতী মা অহল্যা ও উত্তমী, বাতাসী, সরোজিনী।


প্রতিটি ঘটনায় তেভাগার ইতিহাসে মেয়েদের গৌরবোজ্জল ভূমিকার স্বাক্ষ্য বহন করে। স্বভাবতই এই আন্দোলন মেয়েদের সামাজিক অধিকার ও মর্যাদাকে কিছুটা হলেও বৃদ্ধি করেছিল। পাশাপাশি তারা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, মিটিং এ বসে সরব হয়েছেন নিজের স্বামীর বিরুদ্ধেও। তাই নারী মুক্তি আন্দোলনেও তেভাগা আন্দোলনের প্রভাব অনস্বীকার্য।


সূত্র:
তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস: কুনাল চট্টোপাধ্যায়: প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা
Custers, Peter; Women Role in Tebhaga Movement; Economic and Political weekly, Vol. 21, No. 43 (1986) pp. WS97- WS104.

One Response to “তেভাগার আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা”

  1. তথ্যপূর্ণ লেখাটির জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: