বা ঙা ল না মা

অসমিয়া ভাষা, সিলেটি উপভাষা এবং অসমে ভাষাচর্চার রূপরেখা

Posted by bangalnama on December 22, 2010


- লিখেছেন সুশান্ত কর

।। সিলেটি উপভাষা এবং বরাক উপত্যকার ভয় ।।

বাংলার উপভাষা সিলেটি নিয়ে অসমের বাঙালি যত না চর্চা করেছে বিদগ্ধ অসমিয়া পন্ডিতেরা তার চেয়ে বেশি আলোচনা করেছেন। সেপ্টেম্বর ২০১০-এ প্রকাশিত ‘বাঙ্গালনামা’র দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যাতে প্রকাশিত ‘প্রসঙ্গ সিলেটি ভাষা’ লেখাতে সঞ্জীব দেব লস্কর লিখেছেন, “ইতিমধ্যে সিলেট মদনমোহন কলেজের প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ প্রণব সিংহ, বরাক উপত্যকার জন্মজিৎ রায়, আবুল হোসেন মজুমদার, উষারঞ্জন ভট্টাচার্য কিছু কাজ করেছেন, একটি সম্পূর্ণ অভিধান, বলা চলে কোষগ্রন্থই রচনা করেছেন জগন্নাথ চক্রবর্তী, আর আবিদরাজা মজুমদারের আরেকটি অভিধানও প্রকাশের পথে। বর্তমান লেখকের এ দিকে মোটেই কোনো বিশেষ পাঠ বা অনুধ্যানই নেই।” সঞ্জীব যাদের নাম করেছেন তাদের মধ্যে প্রণব সিংহের সঙ্গে বর্তমান লেখকের পরিচয় নেই। বাকিরা প্রত্যেকেই গবেষক-অধ্যাপক তথা শিক্ষক এবং বহু গ্রন্থের লেখক বটে। উষা রঞ্জন অনুবাদ সাহিত্যে সাহিত্য একাদেমি পুরস্কারও পেয়েছেন এবং বর্তমান লেখকের শিক্ষক। কিন্তু সম্ভবত কেউই পূর্ণকালীন ভাষা গবেষক নন। কেবল মাত্র সম্প্রতি প্রকাশিত জগন্নাত চক্রবর্তীর অভিধান দেখায় গুণগত ভাবে প্রয়াসগুলো যাই হোক না কেন, পরিমাণগত দিক থেকে তাঁর ভাষা অধ্যয়ন বেশ সুগভীর এবং আন্তরিক। যদিও তিনি ‘বরাক বাংলা’ বলতে ঠিক কোনটিকে বোঝাতে চেয়েছেন সেই প্রশ্নটি অস্পষ্ট থেকেই গেছে। সঞ্জীব বরাক উপত্যকার বিদগ্ধ লেখক । তাঁর কথাতে নির্ভর করতে পারি ।


সঞ্জীব সঙ্গতকারণেই “…এ সময়ের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে” অভিযোগ জানিয়ে লিখেছেন, “… এ উপভাষাকে একটা ভাষার স্খলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেও প্রয়াসী।” তিনি বেশ উৎসাহ ভরে লিখেছেন ,”… এখন শিল্প সংস্কৃতির রাজধানী কলিকাতায় জিন্স পরা ইলেকট্রনিক যন্ত্র হাতে নাগরিক ব্যান্ডের শিল্পীরা (দোহারঃ লেখক) দুনিয়ার যত বাঙাল কবির পদ গেয়ে আসর জমিয়ে রাখছে। সিলেটি হাসন রাজাকে তো কবিগুরু অনেক আগেই জগৎ সভায় প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন। …আমাদের ভাষাপৃথিবীর এই যে বিস্তৃতির সূচনা, এটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বিভিন্ন ঔপভাষিক অঞ্চলের বাঙালিদের সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন।” কিন্তু এর পরেই লিখলেন, “এ অবস্থায় বরাক উপত্যকার বাঙালিরা সিলেটি ভাষা, অর্থাৎ উপভাষা নিয়ে অতি উৎসাহী হলে, এদের ভাষিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে সদা সচেষ্ট এক শ্রেণির অসমিয়া নেতৃত্ব একটা বিশেষ মওকা পেয়ে যেতে পারেন।” এই শেষোক্ত মন্তব্য একটি ধোঁয়াসা তৈরি করে । এটি বরাক উপত্যকার বিদ্যায়তনিক মহলে একটি প্রতিষ্ঠিত অভিমত। এক গড়ে তোলা চিহ্ন বিশেষ। এই ভয়ের স্পষ্ট কারণ হলো সিলেটি আর অসমিয়ার মধ্যেকার মিলগুলো খুবই চোখে পড়বার মতো । তাতে করে সুনীতি চট্টপাধ্যায়ের ছাত্র বাণীকান্ত কাকতি বাদে প্রায় সমস্ত অসমিয়া ভাষাতাত্বিক সিলেটিকে অসমিয়া বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেন। এই তালিকাতে শেষতম সংযোজন ড০ উপেন রাভা হাকাচাম ।


অসমিয়ারা উপভাষাটিকে দখল করে নেবেন এই ভয়ে সিলেটি নিয়ে বেশি চর্চা না করবার, নাটকে, গল্পের সংলাপে সিলেটি ব্যবহার না করবার, রেডিও, টিভিতে সিলেটি ব্যবহার না করবার পরামর্শ বরাক উপত্যকার বেশ খ্যাতনামা বিদগ্ধজনেরা দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছেন। তাদের মধ্যে অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য, ‘সাহিত্য’ সম্পাদক বিজিত ভট্টাচার্যও রয়েছেন। যে চিহ্নায়নের প্রতাপেই অসম তথা বরাক উপত্যকাতেই , শুধু যে এই উপভাষা নিয়ে তাই নয়, সামগ্রিক ভাবেই ভাষা নিয়ে বাংলাতে অধ্যয়ন হয়েছে অতি অল্প। ১৯শের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কতটা সঠিক ভাবে কে লিখলেন তাই নিয়ে সেখানে রীতিমত প্রতিযোগিতা চলে, হয় না শুধু ভাষা নিয়ে কোনো অধ্যয়নের প্রয়াস। অথচ, গোটা পূর্বোত্তরের অঙ্গ হিসেবে বরাক উপত্যকাও যেহেতু এক বহু ভাষিক অঞ্চল ভাষা গবেষণার পক্ষে অঞ্চলটি প্রায় অনাবিষ্কৃত সোনার খনি। এই অভিমতটি অনেকটা এরকম — নিজের সুন্দরী বৌকে বেশি লোক দেখিয়ে বেড়ানোর দরকার নেই , কেননা প্রতিবেশি মাতব্বরের চোখ রয়েছে তার উপর ! সুতরাং বোরখা চাপাও, ঘোমটা চড়াও। আড়াল করো, পর্দা টানো ! রক্ষণশীলতা আর বলে কাকে !


এই যে সঞ্জীব লিখলেন, “এক শ্রেণির অসমিয়া নেতৃত্ব একটা বিশেষ মওকা পেয়ে যেতে পারেন।” চিহ্নায়নের এমন প্রক্রিয়াতে তাঁরা যে অসমিয়া ভাষাতাত্বিকদের এমন মওকা দিয়েই বসে আছেন, এই সত্যও মনে হয় না বরাকের অনেকে জানেন। কারণ জানতে গেলেও চর্চা করবার উৎসাহ চাই। বরাক উপত্যকার ভাষাচর্চা করেন এমন এক বন্ধুর সঙ্গে সাম্প্রতিক এক আলোচনাতে তাঁকে যখন জানালাম যে অসমিয়াতে এক জাতীয় অভিধান লেখা হয়েছে আর সেটি গোটা অসমে বেশ হৈচৈ ফেলে দিয়েছে, তাঁর সদম্ভ উক্তি ছিল, “ধুস! অসমীয়াতে কি কেউ ভাষা তাত্বিক রয়েছে!” অথচ এই জাতীয় অভিধানের তার তুল্য কাজ সত্যি বাংলাতে হয় নি , আর সম্ভবত হওয়া সম্ভবও নয়। এরা মুল ভাষার সঙ্গে অসমিয়ার সমস্ত উপভাষাকে এক জায়গাতে এনে জড়ো করে ফেলেছেন এই অভিধানে । প্রথম খন্ড বেরিয়েছে, আরো তিনটি বেরুচ্ছে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে অন্যত্র অন্য সময়ে লেখা যাবে । বর্তমান লেখকের ধারণা সিলেটে যারা সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন তারাও ভাষাটি নিয়ে বেশ গভীরে গিয়ে কিছু কাজ করছেন। দেশে না পারুন বিলেতে তারা স্কুলে কলেজেও ভাষাটাকে শেখাবার কাজ করে ফেলছেন। সঞ্জীব “এদের পেছনে কিছু সন্দেহজনক চক্রও সক্রিয়” থাকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অথচ সঠিক অবস্থান হতো, এই প্রবণতার সমাজতাত্বিক কারণ অনুসন্ধান করা। সংশয়বাদ নতুন চিন্তার পথ খুলে দেয় বটে, কিন্তু অনেক সময় তা নতুন চিন্তার পথ রুদ্ধও করে। বিশেষ করে যদি সেই সংশয় পথচ্যুত হয়। কোনো ‘চক্র’ নিয়ে সন্দেহটা চরিত্রগত দিক থেকে ভাষাতাত্বিক নয়, রাজনৈতিক। এমন বৈদগ্ধ যেমন নিজের দৌর্বল্যকে প্রকাশ করে , তেমনি যার সঙ্গে মিতালি করে নিজের পথ করে নেয়াটা খুবই সহজ তাকেই ঠেলে দেয় অহেতুক শত্রু পক্ষে। একটা অবৈরি দ্বন্দ্বকে করে রাখে বৈরি।


কিছু অসমিয়া ভাষাতাত্বিক সিলেটিকে অসমিয়া বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেন যদি এইমাত্র অপরাধে কেউ বলে উঠেন যে , “ধুস….স…..!” তবে রবীন্দ্রনাথ নিয়েও বলতে হয়,“ধুস! রবীন্দ্রনাথ ভাষাতত্বের কিছু বুঝতেনই না!” তিনি এক`বার লিখেছিলেন , “সেইজন্য বলিতেছিলাম, আসাম ও উড়িষ্যায় বাংলা যদি লিখন পঠনের ভাষা হয় তবে তাহা যেমন বাংলাসাহিত্যের পক্ষে শুভজনক হইবে তেমনিই সেই দেশের পক্ষেও। কিন্তু ইংরেজের কৃত্রিম উৎসাহে বাংলার এই দুই উপকণ্ঠবিভাগের একদল শিক্ষিত যুবক বাংলাপ্রচলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহধ্বজা তুলিয়া স্থানীয় ভাষার জয়কীর্তন করিতেছেন।” এই পর্যন্ত মনে হবে রবীন্দ্রনাথ নির্ভেজাল বাংলার পক্ষে বলছেন, আর কারো বিরুদ্ধে নয়। তার পরেই লিখছেন, “এ কথা আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, দেশীয় ভাষা আমাদের রাজভাষা নহে, যে-ভাষার সাহায্যে বিদ্যালয়ের উপাধি বা মোটা বেতন লাভের আশা নাই। অতএব দেশীয় সাহিত্যের একমাত্র ভরসা তাহার প্রজাসংখ্যা, তাহার লেখক ও পাঠক-সাধারণের ব্যাপ্তি। খণ্ড বিচ্ছিন্ন দেশে কখনোই মহৎ সাহিত্য জন্মিতে পারে না । তাহা সংকীর্ণ গ্রাম্য প্রাদেশিক আকার ধারণ করে । তাহা ঘোরো এবং আটপৌরে হইয়া উঠে, তাহা মানব-রাজদরবারের উপযুক্ত নয়।” (পৃঃ ৭৪১, ভাষাবিচ্ছেদ;পরিশিষ্ট,শব্দতত্ব; রবীন্দ্ররচনাবলী, ৬ষ্ঠ খন্ড;১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বিশ্বভারতী প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ) । অর্থাৎ তিনি অসমিয়া ওড়িয়ার মত ভাষাকে সাহিত্য চর্চার ভাষা বলেই ভাবছেন না । রচনাটি অবশ্যি পরে পরিত্যক্ত হয়ে ‘শব্দতত্বে’র পরিশিষ্টে যুক্ত হয়েছে। আমার সেই পূর্বোক্ত বন্ধুটি এই একুশ শতকে এসেও রবীন্দ্রনাথের ফেলে আসা চিন্তার থেকে বেশি এগুতে পারেন নি । দুটো ভাষার মধ্যে মিল দেখে যদি, অসমিয়ারা বলতে শুরু করে যে সিলেটি অসমিয়ারই উপভাষা তবে ওই একই যুক্তিতে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দাবিটিও দিব্বি দাঁড়িয়ে যায়। আর অসমিয়া হয়ে যায় বাংলা ভাষা, বাংলা হয়ে যায় হিন্দি, হিন্দি হয়ে যায় উর্দু! উর্দু হয়ে যায় পার্শি। এমন হালকা যুক্তি, এক করে না। সাময়িক ভাবে ভয়ে আতঙ্কে একাকার করে রাখতে পারে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এই যুক্তিগুলো যে কেমন প্রবল বিভেদের বীজ বপন করে তা আমরা অসম , বাংলাদেশ, পশ্চিম বাংলা তথা উপমহাদেশের রাজনীতিতে বহুবার দেখেছি , আগামীদিনগুলোতেও আরো অনেক দেখতে পাব। তার চে’ কি ভালো নয় এই সন্ধিচুক্তিতে সই করা যে , “ভাই, কার ভাষাটি যে কি, তা ঠিক করবে শুধু সেই যে ঐ ভাষাটিতে কথা বলে। অন্যে নয়।”


একালের এক বিদগ্ধ বাঙালি ভাষাবিদ পবিত্র সরকার এক জায়গাতে লিখেছেন , “যারা মনে করে, যে ভাষাটা বলছি সেটা বাংলা, সেটা আমার পরিচয়, তারাই বাঙালি।” কিন্তু এর পরেই তিনিও উল্টো সুরে গেয়েছেন , “কেউ কেউ ‘বাংলা’ নামটা জানেন না, কিন্তু তাঁদের ভাষা যদি পন্ডিতের বিচারে ব্যাপক বাংলার অন্তর্গত হয়, তাঁরাও বাঙালি।” ( বাঙালি কে?; ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ) এই ‘পণ্ডিতে’র কর্তৃত্বের দরকারটা তাঁর মতো বাম শিবিরের ভাষাবিদেরও পড়ে, কেননা তাঁকেও যে রাজবংশীদের বাংলাভাষা বৃত্তের থেকে আলাদা হয়ে যাবার প্রবণতাকে ‘শিক্ষবিস্তারের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ’ বলে অন্যত্র দেখাতে হবে! ( ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ;ঐ) এমন ,’শিক্ষবিস্তারের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ’ নিয়ে যাদের কাজকারবার তারাই শুধু দুটোভাষার ঐক্যের সূত্রগুলোকে দিয়ে অনৈক্যের মহিরুহ বপন করতে পারেন। এই যে অসমিয়া, বাংলা,হিন্দি,উর্দু কিম্বা পার্শি —এগুলোর আলাদা ভাষানাম হবার কারণটাইতো এই যে ওদের মধ্যে প্রচুর মিল থাকা সত্বেও কিছু অমিল রয়েছে যেগুলো নির্ধারক। এদের কেবল গঠন নয়, ভূগোল ইতিহাস এবং ব্যবহারকারীদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্ধারণ করে ওরা আলাদা নামে পরিচিত হবে না স্বতন্ত্র নামে। ‘অসমীয়া আরু তিব্বত বর্মীয় ভাষা’ বইতে উপেন রাভা হাকাচাম লিখেছেন, “ ভাষা-বিজ্ঞানর সহজ-সূত্রতে সীমাবদ্ধ না থাকি দুটা ভাষার আংশিক সাদৃশ্য দেখিলেই ইটো ভাষা যে সিটোতকৈ অধিক সমৃদ্ধশালী তাক জাহির করার প্রবণতাই নির্মোহ আলোচনার ব্যাঘাত ঘটাইছে।” এই একই কথাতো কেবল ভাষাগত গঠন দেখিয়ে দুটো ভাষার এক নামে চিহ্ণিত করে ফেলবার প্রয়াস যারা করেন তাদের বেলাও খাটে। এমন প্রয়াস কেবল ভাষাতত্বেরই বিরোধী নয়, এই প্রয়াস রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক এবং ভৌগলিক ইতিহাসেরও বিরোধী বটে।


সিলেটি তথা পূব বাংলার ভাষাগুলো যে অসমিয়ার বেশ ঘনিষ্ট ভাষা এমন চিন্তার পথিকৃত কিন্তু স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ । সুনীতি চট্টপাধ্যায়তো সরাসরি লিখেই ফেলেছেন, “ The Bengali Dialects of the Extream east and south-east (Sylhet, Chittagong) are certainly more removed from Standard Bengali than is Assamese.” ( OBDL;পৃঃ১০৮) । ভাষা রাজনীতি ছেড়ে ভাষা দুটোর তুলনামূলক ভাষাতাত্বিক অধ্যয়ন করলে কিন্তু অনেক অনুন্মোচিত তত্ব আর তথ্য বেরিয়ে আসবার সম্ভাবনা এখনো প্রবল। শুধু অসমিয়াই কেন, চাকমা, হাজং, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি,রাহবংশী ইত্যাদি ভাষার সঙ্গেও তুলনামূলক আলোচনা হতেই পারে। যদিও এই শেষোক্তভাষাগুলোকে বাংলা বলে চালিয়ে দেবার, ‘শিক্ষবিস্তারের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ’ উপস্থিত করবার ব্যামো থেকে আমরা নিজেরাই এখনো বেরুতে পারিনি । আমাদের যত রাগ সেই অসমিয়াদের বিরুদ্ধে যারা সিলেটিকে অসমিয়া বলে দাবি করেন। সেই দাবির চেহারা কেমন আমাদের বর্তমান প্রবন্ধে তারই এক রূপ রেখা তুলে ধরব।


।। ‘অসমিয়া কে ? ঃ অসমিয়া ‘ সংজ্ঞার সমস্যা ।।

সেই ১৯১৩ সনে বেণুধর রাজখোয়া তাঁর Notes on the Sylhetee Dialect বইতে সিলেটিকে অসমীয়া বলে দাবি করা শুরু করেছেন। তাতে শেষতম সংযোজন ড০ উপেন রাভা হাকাচাম। তিনসুকিয়া মহাবিদ্যালয়ে ২০০৯ সনে অসমের ভাষা উপভাষাগুলো সম্পর্কে এক বক্তৃতা দিতে এসছিলেন ড০ হাকাচাম । সেখানে তিনি এমন দাবিও করেছিলেন যে বহু প্রকৃত অসমিয়াও অসমে তত খিলঞ্জিয়া নন সিলেটিরা যতটা খিলঞ্জিয়া , যতটা প্রাচীন। কথাটা তিনি ময়মনসিংহ মূলের মুসলমানদের সম্পর্কেও বলেছিলেন, যাদের সাধারণভাবে প্রায় সব্বাইকে বাংলাদেশি বলে ভেবে নেয়া হয়। তিনি তাই যাকে তাকে বিদেশি, ‘খিলঞ্জিয়া নহয়’ বলে প্রত্যাখান করবার প্রবণতার বিরোধীতা করেছিলেন এমন একটি সভাতে যেখানে সিলেটি শ্রোতা দু’ একজন যদিও বা ছিলেন ,ময়মনসিংহ মূলীয় একজনও ছিলেন না। কাউকে খুশি করবার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বরং কেউ কেউ এমন উক্তিতে বিরক্ত হলেও হতে পারতেন। কেউ যে হলেন না, তার কারণ ‘যিনি খিলঞ্জিয়া তিনিই অসমিয়া’ এমন এক ভাব অসমে বহুল প্রচলিত রয়েছে।


‘কে অসমিয়া?’ ( অসমিয়া কোন?) এই নিয়ে গেল ক’বছরে অসমের আলো-হাওয়া রৌদ্র বেশ সরগরম। অনেকে অনেক কথা বলেছেন, এখনো কেউ কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেন নি। এই বিতর্কে দুটো প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে । একদল রয়েছেন যারা মনে করেন, যার মাতৃভাষা অসমিয়া, যিনি শয়নে স্বপনে অসমিয়া ভাষা -সংস্কৃতি তথা জাতির উন্নতির জন্যে ভাবেন এবং কাজ করেন তিনিই অসমিয়া। অন্য প্রবণতাটি অল্প শিথিল। এই দ্বিতীয় দল মনে করেন মাতৃভাষা অসমিয়া হতেই হবে এমন কোনো কথা নেই । কিন্তু অসমের মাটিকে যিনি আপনার করে নিয়েছেন অসমের ভাষা সংস্কৃতি সম্পদের প্রতি যার ভাব ভালোবাসা আছে তিনিই, যিনি আর কোনো রাজ্য বা দেশকে তার নিজের রাজ্য বলে ভাবেন না তিনিই অসমিয়া। যে বক্তৃতার কথা লিখলাম সেখানে ড০ হাকাচামও স্পষ্টতই বলেছেন , তিনি অসমিয়া বটে , কিন্তু অসমিয়া তাঁর মাতৃভাষা নয়। ধাতৃভাষা । তাঁর মাতৃভাষা রাভা । কিন্তু মুস্কিল হলো, এই দুই প্রবণতার মধ্যেকার জলবিভাজন রেখাটি প্রায়ই অস্পষ্ট। তাছাড়া, যেখানে ভারতের অধিকাংশ লোকই দেশপ্রেমের কোনো পরীক্ষা না দিয়েই , অথবা অনেক সময় তেমন কোনো পরীক্ষাতে ব্যর্থ হলেও ভারতীয় থেকে যান, সেখানে একজন ব্যক্তি যার মাতৃভাষা অসমীয়া নয় তাকে যদি সারাক্ষণ অসম প্রেমের পরীক্ষার মধ্যি দিয়ে জীবন যাপন করতে হয় তবে জীবন যে কত স্পর্শকাতর আর দুর্বিষহ হয় সে প্রশ্নের উত্তর কখনো কোনো অন্যভাষীদের থেকে জানতে চাইলে জানা যেত। কিন্তু, সেটি চায় বা কে!


এমন এক জটিল সামাজিক স্থিতিতেই উপেন রাভাকেও লিখতে হয়েছে এটি তাঁর বই পড়লেই বোঝা যায়। তাই তিনিও ‘অসমীয়া’ অবিধার ওই দুই প্রবণতাতেই যাতায়াত করেছেন। ‘অসমীয়া আরু অসমর ভাষা-উপভাষা’ বইএর মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন, “ইয়াত আলোচিত ভাষার সমলরাজি দরাচলতে উপভাষা (আঞ্চলিক), স্থানীয় উপভাষা নে নৃগোষ্ঠীয় উপভাষা–ইয়াক চিহ্ণিত আরু নামকরণ করাটো অতিশয় স্পর্শকাতর বিষয়।” বর্তমান লেখককেও তেমনি সামাজিক স্থিতির কথা মনে রেখেই এই প্রবন্ধ লিখে যেতে হচ্ছে । তাঁর এই স্বীকারোক্তি কিম্বা সঞ্জীবের পূর্বোক্ত সংশয় এটিও প্রমাণ করে যে ভারত তথা অসমে নিরাসক্ত নিরপেক্ষ সমাজবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্যে সামাজিক পরিবেশ এখনো তেমন অনুকুল নয়।


ড০ উপেন রাভা হাকাচাম কেবল অসমেরই নন, তীব্বত বর্মীয় ভাষাগোষ্ঠীর উপর তিনি এখন গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চলেই একজন খ্যাতনামা এবং নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ। গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসমিয়া বিভাগের অধ্যাপক ড০ হাকাচাম তিব্বত বর্মী ভাষা এবং ভাষাতত্ব পড়িয়ে থাকেন। বাংলাতে ভোট বর্মী বা অষ্ট্রিক মূলীয় ভাষাগোষ্ঠীদের নিয়ে বিস্তৃত অধ্যয়ন এখনো দুর্লভ। অসমীয়াদের মধ্যে ড০ প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্য A Descriptive Analysis of the Bodo Langauage নিয়ে সেই ১৯৬৫তে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেছিলেন। সেটি বই হিসেবে বেরোয় ১৯৭৭এ। তিনি এর পরেও কিছু কিছু কাজ করলেও ঠিক দুই দশক পর ১৯৯৭তে লেখা হলো আরেকটি দিকদর্শক বই ‘Rabha and Assamese Languages: A Comparative Studies’ ড০ উপেন রাভা হাকাচামের পি এইচডি গবেষণা পত্র। তাঁর পরে তিনি রাভা, অসমিয়া এবং ইংরেজি ভাষাতে এই পথে নিরলস কাজ করে চলেছেন। তার মধ্যে অসমিয়াতে লেখা দু’টো বই আমাদের বর্তমান নিবন্ধের জন্যে বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য। একটি ‘অসমীয়া আরু অসমর তিব্বত-বর্মীয় ভাষা’ এবং দ্বিতীয়টি ‘অসমীয়া আরু অসমর ভাষা উপভাষা।’ এই দুটিতেই তিনি অসমের প্রায় সমস্ত ভাষাগুলোকে ছুঁয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন। শুধু হিন্দি এবং বাংলা ছাড়া । সম্ভবত এটি ধরে নিয়েছেন যে এ দুটো অসমের বাইরের ভাষা । কিন্তু হিসেব মেলে না যখন দেখি, নেপালি আর সাদরি ভাষার সঙ্গে বইগুলোতে সিলেটি আর ময়মন সিংহের বাংলা উপভাষা দিব্বি জায়গা করে নিয়েছে। কারণটি বোঝা যায় যদি, ভেবে নিই আসলে তিনি অসমে প্রচলিত ভাষাগুলো নয় ঠিক সেই ভাষাগুলো নিয়েই অধ্যয়ন করেছেন যেগুলোকে কোনো না কোনো ভাবে অসমিয়া ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে এনে ফেলে দেয়া যায়। সিলেটিকেও অসমিয়ার একটি উপভাষা বলতে বলতে থেমে গেছেন। জোর দিয়ে বলতে যে পারছেন না, তাই নিয়ে তাঁর আক্ষেপও অস্পষ্ট নয়। কেন আর কেমনতর আক্ষেপ সে নিয়ে আমরা যথা স্থানে লিখব। কিন্তু এই তথ্য জানিয়ে দেয়া ভালো যে এই দুট বইএর প্রথমটিতে ২৭৬ থেকে ৩০০ অব্দি ২৫ পৃষ্ঠা এবং দ্বিতীয়টিতে ১০ থেকে ১৩ অব্দি ৩ পৃষ্ঠা তিনি সিলেটির জন্যে বরাদ্দ করেছেন। আলাদা করে লিখলে শুধু এইগুলো নিয়েই একটি ছোট্ট কিন্তু মূল্যবান পুস্তক হয়ে যেতে পারে ।


যে মুখবন্ধের কথা আমরা লিখছিলাম সেখানেই তিনি খানিক পরে লিখছেন , “সেইদরে হাজং, মৈমনসিঙীয়া,চিলটীয়া (কাছারী), দেহান, রাজবংশী আদি বাংলা বা অসমীয়ার একোটা উপভাষা হিচাপেহে বিবেচিত হৈ আহিছে যদিও বর্তমান স্বতন্ত্র ভাষা হিচাপে স্বীকৃতি প্রদানর ক্ষেত্রত সেই সেই ভাষা-ভাষীর মাজত রাজনৈতিক আরু বিদ্যায়তনিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাইছে।” তথ্য হিসেবে কথাগুলো মোটের উপর সঠিক। শুধু, ‘দেহান’ রাজবংশীরই একটি উপভাষা হলেও এখনো তাদের মধ্যে ভাটি অসমের রাজবংশীর মতো অসমিয়ার থেকে বেরুবার তাগিদ নেই। আর ‘সিলেটি’দের অতিক্ষুদ্র এক বাংলাদেশি অংশই এখনো ওই স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার। মৈমনসিংহমুলীয়দের যারা অসমিয়া বলে এককালে লিখিয়েছিলেন তাদের মধ্যে এখন বাংলা মূলে ফিরে আসবার প্রবণতা বাড়ছে । হাজং এবং রাজবংশীদের দাবিটা বোধহয় বিশুদ্ধ, কিন্তু স্বীকৃতি মিলছে না ।


সিলেটি উপভাষা নিয়ে তিনি এই বইএর পঞ্চম অধ্যায়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। সে অধ্যায়ের নাম “ অসমীয়ার জাতিগত/ সামাজিক শ্রেণিগত উপভাষা” এর উপ-অধ্যায় বিভাজনও বেশ চিত্তাকর্ষক । ১) চাহ জনগোষ্ঠীর কথিত ভাষাঃসাদরি বা বাগানীয়া ;২) অভিবাসী মুসলমানর কথিত ভাষা (ভাটিয়া) আরু বাংলার মৈমন সিং উপভাষা;৩) নেপালী সকলরর কথিত অসমীয়া আরু অসমর নেপালী ভাষা; ৪) বরাক উপত্যকার চিলেটিয়া (কাছারী) উপভাষা; ৫) কাছারর দেহান বা ধেয়ান উপভাষা।


মুখবন্ধেও তিনি অসমের বেশ কিছু সামাজিক শ্রেণি উপভাষার নাম করেছেন , “নেপালী সকলর নেপালী- অসমীয়া, অভিবাসী সম্প্রদায়র উজানী (দেশী) আরু ভাটিয়া (ময়মন সিঙীয়া) অসমীয়া, কাছারর বাঙালীসকলর চিলেটীয়া (কাছারীয়) অসমীয়া, অভিজাত আরু শিক্ষিত বাঙালী পরিয়ালর ঔপনিবেশিক অসমীয়া (ব্রিটিছর দিনত মফচলীয় আমোলাপট্টিত আরু সম্প্রতি রেলোয়ে কলনিত এনে ভাষার নমুনা পোয়া যায়) ,নগর-মহানগর কেন্দ্রিক মাড়োয়ারী সম্প্রদায়র হিন্দী মিশ্রিত বজরুয়া অসমীয়া (broken Assamese), কুলি-নাপিত-ধোবা-রিক্সাওয়ালা আদি বৃত্তিজীবি লোকর দেশোয়ালী অসমীয়া ইত্যাদি এই শ্রেণীর অসমীয়ারূপে অতি সম্প্রতি বহুভাষিক অসমীয়া মাতৃভাষী চাকরিজীবি ,ব্যবসায়, গৃহীণী আরু ছাত্র-ছাত্রীকো প্রভাবান্বিত করি ‘চলতি অসমীয়া’ বা ‘জনপ্রিয় অসমীয়া ভাষা’র প্রচলনত ইন্ধন যোগাইছে।” এর থেকে স্পষ্ট তিনি ‘চিলেটীয়া অসমীয়াদে’র ‘অসমীয়া মাতৃভাষী’দের সঙ্গে একাকার করছেন না। বরং সিলেটিকে অসমের ভাষা অর্থেই অসমিয়া বলছেন। তাহলে এই ভাষাগুলোকে তিনি উপভাষা কেন বলছেন এই প্রশ্ন উঠতেই পারে । এই প্রশ্নও অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে যে মূল অধ্যায়ে তিনি মারোয়াড়ি বা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার রেল ওয়ে কলোনির বাংলাকে নিয়ে আলোচনা করতে উৎসাহ দেখালেন না কেন? শুধু তিনিই নন, প্রায় কোনো অসমিয়া ভাষাবিদকেই এদের নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করতে দেখা যাবে না।


সাদরি ভাষাকে যে তাদের ভাষাবিশেষজ্ঞরা স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে দাবি করেন সেটি তিনি মূল অধ্যায়ে বেশ সম্মানের সঙ্গেই উল্লেখ করেছেন , “সাদরি ভাষার বিশেষজ্ঞসকলর মতে ই এটা স্বতন্ত্র আরু পূর্ণাঙ্গ ভাষা , ই কারো মিশ্রিত ভাষা নহয়।” সাদরিকেই সুকুমার সেন প্রমুখ অনেকেই বাংলার ঝাড়খন্ডি উপভাষা বলবার ভুল করেছিলেন । উপেন রাভা হাকাচামও কিন্তু লিখেছেন, ‘…সেইবাবে বহুতে সাদরিক বাংলার ভগ্নীভাষা বুলিহে ক’ব বিচারে……সামাজিক আরু রাজনৈতিক কারণত বাংলা ভাষাই যিমান দ্রুতবেগত বিকাশ আরু বিবর্তন লাভ করিবলৈ সক্ষম হৈছে; তার বিপরীতে সাদরি ভাষার এটা বিশেষ সময়লৈকে বিকাশর ধারা আছিল তেনেই স্তিমিত। সেই কারণে বাংলার ভগ্নীভাষা হোয়া সত্বেও দুয়োটার মাজত দূরত্ব বাঢ়ি গৈছে…।” অসমে এর উপর অসমিয়ার ব্যাপক প্রভাব পড়বার বিষয়ে তিনি এর পর বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। এতে ভাষাতাত্বিক দিক থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যেত যে এখানে সাদরির আরো এক বা একাধিক উপভাষা গড়ে উঠেছে। কিন্তু, সিদ্ধান্ত ভাষাতাত্বিক না হয়ে হয়ে পড়ে ভাষারাজনৈতিক। তিনি এর পরে লেখেন, “…যেতিয়ারে পরা অসমর চাহ-বাগিচাসমূহত শিক্ষার মাধ্যম হিচাপে অসমীয়া ভাষা সাহিত্যর পঠন-পাঠন হ’বলৈ ধরিলে, আনকি বহু প্রাক্তন চাহ-বনুয়াই ঘাই অসমীয়া জনজীবনর লগত মিলি জীবন নির্বাহ করার ( বৈবাহিক আরু সামাজিক ভাবেও) পরিবেশ রচনা করিলে তেতিয়াই অসমীয়ার এই স্থানীয় উপভাষা বা মান্য অসমীয়াই তেওঁলোকরো মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করিবলৈ ধরিলে।” একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র ভাষার একাংশ কালে গিয়ে আরেকটি স্বাধীন স্বতন্ত্র ভাষার উপভাষা হয়ে উঠতে পারে কিনা সেই ভাষাতাত্বিক প্রশ্ন তোলাই রইল। তাঁর কিন্তু বিশ্বাস, স্বাধীন স্বতন্ত্র অসমিয়া ভাষার একাংশ সিলেটি ভাষাটিও কালক্রমে বাংলার উপভাষা হয়ে পড়েছে । কীভাবে—- সে কথাটি আমরা পরে আবার পাড়ব। কিন্তু , এমন এক সিদ্ধান্ত যা একেবারেই ভাষাবিজ্ঞানের বিষয় তাই নিয়ে নিয়ে আলোচনা করবার কোনো মুক্ত পরিবেশ আছে কিনা সেই প্রশ্ন কিন্তু আমাদের মনে তীব্রভাবেই রয়েছে । প্রশ্নটি তুলতে চাইলেই সঞ্জীবের মতো বলে দেয়া হতে পারে,আর সেটি অসমিয়া হতে চাওয়া বা হয়ে যাওয়া সাদরিরাও বলতে পারেন, “এদের পেছনে কিছু সন্দেহজনক চক্রও সক্রিয়, যারা অসম আর অসমীয়াকে ভাগ করতে চায়। ” এই কথাও আমাদের মনে রাখা ভালো যে সাদরিকে বাংলার কিম্বা হিন্দির উপভাষা বলে চালিয়ে দেবার মতো লোকের অভাবও কিন্তু এই অসমেও কম নেই। বরাক উপত্যকাতে এদের হিন্দিভাষী বলে চালিয়ে দিয়েই ভোটের রাজনীতিটি হয়ে থাকে। ১৫ জন ভাষা শহিদের উপত্যকাতে কেউ এখনো এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবার সাহস করে উঠতে পারেন নি।


মৌখিক ভাবে দুই উপত্যকাতেই সাদরি ‘চা-জনজাতির’ বা ‘বাগানীয়া’ ভাষা হিসেবেই অত্যন্ত অপমান জনক ভাবে পরিচিত। সাধারণ লোকে এদের ‘কুলি’, ‘লেবার’ও বলে থাকেন, তা ব্যক্তিটি যদি কলেজ অধ্যাপক হন তবুও। উপেন রাভাও ‘বাগানীয়া’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।তাই, সাদরি ভাষার একাংশ অসমে নিজেদের ঝাড়খন্ডি জনজাতি হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই লড়ছেন। সাদরিতে আজকাল রেডিও টিভিতে স্বতন্ত্র অনুষ্ঠান হয়েই থাকে । অদূর ভবিষ্যতে তারাও সেই প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলো তুলতেই পারেন। অবশ্যি এই প্রবণতাও দেখবার মতো যে অসমিয়ার এক উপভাষা বলে প্রচারিত হওয়া সত্বেও সাদরিতে অসমে যত গান, চলচ্চিত্র ইত্যাদি তৈরি হয়েছে সম্ভবত বাংলাকেও সেখানে পেছনে ফেলে দিয়েছে। ‘চামেলি মেমসাহেবের’ মতো সাদরি -অসমিয়া মিশ্রিত ধ্রুপদী ছায়াছবি অসমেই তৈরি হয়ে ভারত বিজয় করতে সমর্থ হয়েছিল। পরে এর বাংলা ও হিন্দি সংস্করণও বেরিয়ে দর্শক মন মোহিত করেছিল।


এতো কথা আমরা লিখলাম এই কথা স্পষ্ট করতে যে , বিবাদটি নেহাতই অসমিয়া বনাম সিলেটি বাংলার নয়। বিবাদটি ভাষা বিজ্ঞান বনাম ভাষারাজনীতিরও বটে । এই বিবাদ ভাষা নিরপেক্ষভাবে ‘জাতীয়তাবাদে’র ধারণার আভ্যন্তরীণ বিসঙ্গতিরও পরিণাম বটে, শুধু মাত্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদের নয়। শুধু সিলেটি-অসমিয়ার তুলনা করে কিম্বা না করে বিষয়ের সমগ্রতাকে বোঝা যায় না মোটেও। আমি জানি না, ড০ হাকাচাম বর্তমান লেখকের অনুরোধ মনে রেখেছেন কি না। তাঁকে একান্ত আলাপে অনুরোধ জানিয়েছিলাম, তীব্বত-বর্মী ভাষাগুলোর গবেষক হিসেবে তাঁর উচিৎ কেবল বর্তমান অসম কিম্বা পূর্বোত্তর ভারত নয় প্রাচীন কামরূপ এবং তার সংলগ্ন এলাকা তথা বর্তমান বাংলাদেশের দিকেও দৃষ্টি দেয়া। তাতে, এ অঞ্চলের ভাষাগুলোর আরো অনেক অনেক নতুন দিক সামনে চলে আসবে। যে কথা তাঁকে বলিনি তা এই যে , ঢাকা কিম্বা চট্টগ্রামের উপভাষাগুলোর সঙ্গেও অসমীয়া ভাষার মিল খুব একটা কম পাওয়া যাবে না। সেগুলোরও অধ্যয়ন করলে হয়তো ‘সিলেটি’রা কেন নিজেদের অসমিয়া বলে না এই নিয়ে তাঁর আর কোনো আক্ষেপ থাকবে না। সিলেটি যদি অসমিয়া হয়, তবে সমগ্র পুব বাংলার ভাষাকেও তাই হতে হয় বৈকি । কেননা সেই সমস্ত উপভাষা /স/ কে /হ/ উচ্চারণ করে আর বর্গীয় সমস্ত অঘোষ অল্পপ্রাণকে মহাপ্রাণপ্রায় করে ফেলে। পুব বাঙালিরা বিশুদ্ধ বাংলা /ক,ত,চ,ট,প/ উচ্চারণ করতেই পারে না। আর চাটগেঁয়েরা অসমিয়াদের মতোই নঞার্থক অব্যয় ক্রিয়াপদের আগে —‘নাযাও’, ‘নাখাও’ ইত্যাদি শব্দে যেমন—-উপসর্গের মত ব্যবহার করেন। এখন, যদি এই তর্ক করি যে সিলেটিরা অসমে থাকেন বলেই অসমিয়া, আর অন্যেরা যেহেতু অসমে থাকেননা , তাই তাদের ভাষাগুলোর সঙ্গে অসমিয়ার মিল আশি শতাংশ থাকলেও সেগুলোকে অসমিয়া বলে যাবে না তবে স্পষ্টতই সে তর্ক ভাষাবিজ্ঞানের সীমার থেকে বেরিয়ে পড়ে। উপেন রাভার নিজের জনগোষ্ঠঈ ‘রাভা’রা এই যুক্তিতে অসমে হয়ে পড়েন অসমিয়া, বাংলাদেশ আর পশ্চিম বঙ্গে বাঙালি। আর তাই সিলেটি বনাম অসমিয়ার আলোচনা সেই ১৯১৩র বেণুধর রাজখোয়ার ‘ Notes on the Sylhetee Dialect’ বইএর বাইরে যায়ই না। সব্বাই ঐ ওখান থেকেই শুরু করেন। ড০ হাকাচামও তাই করেছেন।।।


।। সিলেটি বনাম কাছাড়ি উপভাষা ।।

সিলেটি ভাষা এবং তার ভাষা এলাকার সম্পর্কে শুরুর তথ্যগুলো উপেন রাভা গ্রীয়ার্সন আর সুনীতি চট্টপাধ্যায় থেকে নিয়েছেন। গ্রিয়ার্সনেই উল্লেখ আছে এর এক স্থানীয় বৈচিত্র ‘কাছাড়ি’ বলেও পরিচিত , ওখানকার লোকেরা ওই নামেই ওকে চেনে। সঞ্জীব ‘বাঙ্গালনামা’তে প্রকাশিত প্রবন্ধে লিখেছেন, “এর মধ্যে আবার কাছাড়ের সিলেটি উপভাষার সঙ্গে সদর সিলেটের ভাষার কিছু পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্য মূলতঃ উচ্চারণগত। ” ‘ তুই কিতা কররে ‘আর ‘তুইন কিতা করিতরে’ এই দুই বাক্যের পার্থক্য কেবল উচ্চারণের নয় রূপতত্বেরও বটে।সঞ্জীবের মতো উপেন রাভা এ কে বৈশ্যের Case Marker in Sylheti’ প্রবন্ধের উল্লেখ করে পাদটীকাতে লিখেছেন , “স্থানীয় লোকে ইয়াক অকল ছিলটি (Sileti) বুলিয়ে চিনাকি দিয়ে।” কেন অমনটি লিখলেন এটি আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় । সত্য হলো,শুধু মাত্র সিলেটিরাই ‘কাছাড়ি’র অস্তিত্বকেও অস্বীকার করবার চেষ্টা করেন। এতে দুটো বাঘকে এক সঙ্গে শিকার করা যায়। ‘কাছাড়ি’কে আলাদা করে নিয়ে যাবার অসমিয়াদের প্রয়াসকে রোখা যায়, সিলেটিদের সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলে সামাজিক আধিপত্য সুরক্ষিত করা যায়। আসল রাজনীতিতো সেই আধিপত্যেরই, তাই না?


অনেকে ‘কাছাড়ে’র সংস্কৃত উৎসের সন্ধান করবার চেষ্টা নানা সময় করেছেন ,কাছাড়ি’ শব্দটি কিন্তু স্পষ্টতই বডো কাছাড়িদের সঙ্গে সম্পৃক্ত । সেটি যে স্থানীয় ভাবে প্রচলিত নাম এই তথ্যের উল্লেখ উপেন রাভার পক্ষে সুবিধে জনক হতো। এই সুবিধের কথাটি পাদটীকাতে তাঁর দাবিটি থেকেও স্পষ্ট, যেখানে তিনি জানাচ্ছেন, শব্দটি প্রথমে ভোলানাথ তিওয়ারী ব্যবহার করেন । পরে ড০ উপেন্দ্র নাথ গোস্বামী তাঁর ‘অসমিয়া ভাষা আরু উপভাষা’ এবং ড০ প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর ‘ অসমর অবিভক্ত কাছাড় জিলার ভাষা উপভাষা’ ‘বইতে ‘কাছাড়ি’ নামটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। সিলেটি অসমিয়া বিতর্কে এই কাছাড়ি প্রসঙ্গও আরেক চিত্তাকর্ষক বিষয়। ১৯৮৮তে হাইলাকান্দিতে অনুষ্ঠিত অসম সাহিত্য সভার অধিবেশনে এই কাছাড়িকেই ‘বরাকি’ভাষা নাম দিয়ে এই চেষ্টা হয়েছিল যদি ওই টুকরোকে অন্তত অসমিয়ার অনুগত ভাষা করে ফেলা যায়। জগন্নাথ চক্রবর্তী এই উপভাষাকেই ‘বরাক বাংলা’ নাম দিয়ে তাঁর অভিধান লিখেছেন বলে আমাদের ধারণা। অভিধানে এর সংজ্ঞাটি অনেকটাই অস্পষ্ট। তিনি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন, তখন তাঁর এক আত্মীয় এসে তাঁর মুখে ‘গ্রাম্য বাংলা’ শুনে ভর্ৎসনা করেছেন বলে এক সংবাদ তিনি দিয়ে রেখেছেন। ঐটেই আসলে ‘কাছাড়ি’ বাংলা। বরাক উপত্যকাতে বাস করে অভ্যস্থ এমন যে কেউ শুনলেই বোঝেন কে কাছাড়িতে আর কে সিলেটিতে কথা বলছেন।গ্রীয়ার্সনও উল্লেখ করেছেন, স্থানীয় সিলেটিরা একে ‘মুসলমানি’ বাংলাও বলে থাকেন ,এটা না জেনেই যে এই ভাষাতে ওখানকার প্রাচীন হিন্দুরাও, যারা মূলত গ্রামে থাকেন, কথা বলেন। এই প্রাচীনদের বাসভুমি ও ভাষাঞ্চলকে সঠিক ভাবেই জগন্নাথ বরাক উপত্যকার মূল ভাষাঞ্চলের বাংলা বলছেন। সিলেটিকে তিনি অন্য নব্য আগন্তুকদের সঙ্গে আগন্তুক ভাষাঞ্চলের বাংলা বলে স্বতন্ত্র করেছেন।


গ্রিয়ার্সন মাগধী প্রাকৃতের চারটি ঔপভাষিক বৈচিত্রের কথা লিখে গেছেন। তার মধ্যে ‘কামরূপী’ প্রাকৃতের মধ্যে পূর্বী শাখাতে রয়েছে অসমিয়া, পশ্চিমা শাখাতে রয়েছে উত্তর বাংলার কোচ বিহার জলপাইগুড়ির বাংলা ভাষা , রাজবংশী সহ। সিলেটি ‘বঙ্গ-প্রাকৃতে’র পূর্বী শাখার অংশ। পরে কী করে এই সিলেটি ‘কামরূপী’ উপভাষার অঙ্গ হয়ে গেল এটিও আমাদের কাছে বেশ ধোঁয়াসা। সুকুমার সেনও এমন ঔপভাষিক বিভাজন টেনেছেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যথার্থ ভৌগলিক ভাষা জরিপ তখনো হয় নি। এমন কিছু তথ্য সূত্র থেকে উপেন রাভা হাকাচাম এও দাবি করেছেন যে , “ অসমিয়ার গোয়ালপরীয়া বা রাজবংশী উপভাষার সৈতে বিশেষ সম্পর্ক থকা দেহান বা ধেয়ান উপভাষারো বিশেষ বরঙণি নথকা নহয়।” চিলারায়ের সেনা বাহিনীর সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র নদী, বড়াইল পাহাড় অতিক্রম করে গিয়ে কোচ সেনাদের পরিবারেদের কেউ কেউ ওখানে থেকে গিয়ে ‘ধ্যানী’ হয়ে গেছিলেন। এই ঘটনা ঘটেছে মাত্র এই সেদিন সতেরো শতকে। তাদের থেকে বাংলা কিছু শব্দ বাক্যের ঋণ নিয়েছে বটে। তাই বলে সেই ঋণ প্রাচীনতর বাসিন্দা কাছাড়ি -সিলেটিদের ভাষাকেই গড়ে তুলবে এ একটু কষ্ট কল্পনা বলেই আমাদের মনে হয়। অথচ তিনি দাবি করেছেন, “সেইবাবেই এই উপভাষাটোত প্রচলিত আরু কামরূপী উপভাষা বা অসমীয়া মান্যরূপত প্রচলিত প্রায় শতকরা ৭৫টা শব্দই সজাতীয় (cognate) বুলি শব্দর সংখ্যানুপাতিক বিচারত ধরা পরে।” তিনি কোনো সংখ্যানুপাতিক বিচার করেন নি। এই কথাগুলো তিনি নিয়েছেন ড০ উপেন্দ্র নাথ গোস্বামী এবং ড০ প্রমোদ চন্দ্র ভট্টাচার্যের উপরোক্ত দুটি গ্রন্থের থেকে। আমাদের এই সংখ্যাতাত্বিক বিচার নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। এটি সঠিক হবার সম্ভাবনাই বেশি। শতাংশের পরিমাণটা আর একটু বেশি হলেও আমাদের আনন্দিত বই আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ দেখি না। বরং বড়াইল পাহাড় , বরাক সুরমা নদী অতিক্রম করে সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে তিব্বত -বর্মী জনগোষ্ঠীগুলোর প্রব্রজনের সঙ্গে প্রাচীন কামরূপের সঙ্গে সম্পর্কিত করে এই সাদৃশ্যের সন্ধান করলে আরো অনেক পাকা ভিতের উপর তাঁর যুক্তি দাঁড়িয়ে যেত। বর্তমান মেঘালয়ের পশ্চিম পাশে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা জুড়ে রঙপুর, দিনাজপুর, ময়মন সিংহ, জয়ন্তিয়া ইত্যাদি এলাকা যেখানে এখনো বড়ো, গারো, রাভা, রাজবংশীরা ব্যাপক সংখ্যাতে বাস করেন সেগুলোকে উপেন রাভা তাঁর অধ্যয়ন থেকে একেবারেই বাদ দিয়েছেন। তিনি কাছাড়ি বা সিলেটিদেরকে বাংলাদেশের ওই জেলা বা মহকুমাগুলোর থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন করে বুঝবার চেষ্টা করেছেন। বস্তুত প্রায় সমস্ত অসমিয়া ভাষাতাত্বিকেরা এই ভুল গুলো করে আসছেন বলে আমাদের মনে হয়। এমন কি অবিভক্ত সিলেটের দক্ষিণ এবং পশ্চিম ভাগের হবিগঞ্জ , সুনাম গঞ্জের ভাষাকেও তাঁরা কেউ হিসেবে নেন নি। কেন, এটি বোঝা খুব কঠিন নয়। যে বেনুধর রাজখোয়ার নোটকে তাঁরা ‘বেদ’তুল্য মর্যাদাতে তুলে রেখেছেন সেই বেনুধর রাজখোয়া সিলেট মহকুমার প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন। সেই সময়ে ঐ নোটটি লিখেছিলেন। তিনিও সমগ্র জেলাকে অধ্যয়ন করেন নি। অথচ হবিগঞ্জি, সুনামগঞ্জি উপভাষাগুলোও সে সময়ের অসমের ভেতরের সিলেটের ভাষা ছিল।


রংপুর থেকে সিলেট — এই সমগ্র এলাকার ঠিক মাঝখানটিতে এখনো বাস করেন খাসিয়ারা যাদের ভাষাটিতো অস্ট্রিক বটেই, শারীরিক গঠনেও অস্ট্রিক মিশেল ব্যাপক। বরাক নদীর তীরে বদরপুরের সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দির, যেখানে প্রতি বসন্তে বারুণী মেলা বসে এবং ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে কামাখ্যা মন্দির, যেখানে প্রতি বর্ষাতে অম্বুবাচি মেলা বসে —ওই দুটোই আদতে অস্ট্রিক নরগোষ্ঠীর তীর্থভূমি ছিল এই উল্লেখ বহু ঐতিহাসিক করে গেছেন। তাদের মধ্যে বাণিকান্ত কাকতিও রয়েছেন। তাঁর মতে কামরূপ একটি অষ্ট্রিক মূলীয় শব্দ। দুটোই কিন্তু এখন বাঙালিদের প্রধান তীর্থ ক্ষেত্র। অসমীয়াদেরও বটে। কিন্তু বৈষ্ণব ধর্মের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের পর অসমীয়াদের মধ্যে কামাখ্যার গুরুত্ব সত্রগুলোর তুলনাতে কমে গেছে। বর্তমান উত্তর কাছাড়ের জেলা সদরের নাম হাফলং, আর ওদিকে মেঘালয় সিলেট সীমান্তে তেমনি এক শৈলশহরের নাম জাফলং। প্রথমটির মূল বাসিন্দারা এখন যদিও ডিমাসা কাছাড়িরা, দ্বিতীয়টির মূল বাসিন্দার কিন্তু সেই খাসিয়ারা। কোথাওতো এই দুই নরগোষ্ঠীর ইতিহাস এসে মিলে গেছে, নতুবা দুইপ্রান্তের দুই শহরের নামে এতো সুন্দর সাদৃশ্য হবে কেন? নীহার রঞ্জন যেমন বাঙালিদের বেলা বডো মিশ্রণ প্রায় নেই বলে বলেছিলেন, বাণীকান্ত কাকতি অসমিয়াদের ক্ষেত্রেও ওই একই কথা লিখে গেছেন— সেই তথ্যের উল্লেখ উপেন রাভা নিজেই করেছেন। তার মানে অসমিয়া -সিলেটিদের মধ্যে অস্ট্রিক মিশেলটাকেও অস্বীকার করা একেবারেই যাবে না। এই সমস্ত উপকরণই যে সমগ্র পূব বাংলার লোকেদের অসমিয়াদের ঘনিষ্ঠ করেছে সেদিকে দৃষ্টি দিলে লাভ বই ক্ষতিটা কোথায় বোঝা আপাত দৃষ্টিতে কঠিন হলেও, এই অনুমান আমরা করতেই পারি যে এতে না বাঙালিরা না অসমিয়াকেই বাংলা বলে ফেলবার ‘মওকা’ পেয়ে যান এই আতঙ্ক কোথাও না কোথাওতো রয়েইছে। মেঘালয়ের পুবে শুধু বড়াইলের দিকে চোখ না ফেলে পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্রের যে অংশটি বাংলাদেশের মধ্যি দিয়ে গেছে সেদিকে দৃষ্টি দিলে ড০উপেন রাভা দেখবেন ওখানে রাভা, বডো, গারোদের ভাষার স্বতন্ত্র স্বীকৃতি নেই। সত্যিই ওখানে তাদের বাঙালির অংশ করে ফেলবার দুষ্প্রয়াস চলছে! অসমে সিলেটি কেন অসমিয়া হলো না সেই আক্ষেপ না করে বাংলাদেশে ‘রাভা’ কেন বাংলা হতে যাবে, — সেই প্রশ্নটি তোলা তাঁর পক্ষে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজ হবে, নয় কি? ভাষা তত্বের দিক থেকেও প্রশ্নটি বেশ সঙ্গতিপূর্ণ।


অসমিয়া সিলেটির সাদৃশ্য দেখাতে গিয়ে এর পরেই উপেন রাভা হাকাচাম বেণুধর রাজখোয়ার উল্লেখ করেছেন। বেণুধর রাজখোয়ার নোটে পাওয়া যায় , “সিলেট অঞ্চলতো অসমর দরে প্রাতঃস্নান করি মেজি জ্বলাই চুঙা-পিঠা আরু অন্যান্য পিঠা-পনারে মাঘবিহু উদযাপন করা,পথারত নরাবিলাক রৈ যোয়াকৈ মুঠি বান্ধি (গুরির পরা কাটি আঁটি বন্ধার বিপরীতে) ধান দোয়া-চপোয়া করা, আই-বাইসকলর নাম গোয়া (সংকীর্তন) আদি দেখা পোয়া যায়। বিভিন্ন জাতি , বৃত্তি, খেল, ফৈদর বা বিষয়বোরর লগত জড়িত উপাধি (শর্মা, দাস, ডোম-পাটনি;” –এ পর্যন্ত বিশেষ কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু , “ চিলেটর প্রাচীন নাম গোর ( গৌড়)র লগত অসমীয়া মুসলমানসকলক সূচোয়া গরিয়া শব্দর সাদৃশ্যতা–ফা প্রত্যয়ান্ত রাজবংশীয় লোকর নামর সমাহার (সুধর্মফা, জনকফা, রত্নফা); সাধারণ লোকর নামকরণত রাম শব্দর সমাহার (জয়রাম, কালীরাম, কানাইরাম, লখাইরাম, ধনীরাম, লবরাম); অসমীয়ারে বিশ্লেষণ করিব পরা স্থান নামর প্রাধান্য (বুঢ়া গোঁহাই বা বুড়া গোয়াইনর লগত জড়িত গোয়াইন ঘাট, কোঁয়রর লগত জড়িত কুয়রগড়, হাজারিকীয়া বা হাজরিকার লগত জড়িত হাজারকী অঞ্চল, বরুয়ার লগত জড়িত বরুয়া (পাহার), অসম বা আসামর লগত জড়িত আসামপাড়া, আসামপুর আদি স্থান, বগা বা বোকা আরু পানীর লগত জড়িত বগাপানী ইত্যাদি স্থাননাম) অসমীয়ার সৈতেহে তুলনীয়, বাংলা বা অইন ভাষা গোষ্ঠীর লগত নহয়।” অসমিয়া মুসলমানদের একাংশ গৌড়ের নবাব হুসেন শাহের আমলে গৌড় বাংলা থেকে এসছিলেন বলে তাদের ‘গরিয়া মুসলমান’ বলা হয়ে থাকে বটে। এখন, এই ‘গরিয়া’দের দেখিয়ে যদি কাউকে অসমীয়া বলে দাবি করা যায় তবে সে গৌড়বাংলার সমস্ত মানুষকে। খামোখা সিলেটিদের নিয়ে এই অযৌক্তিক টানাটানি কেন ? শুধু এই মাত্র তথ্যই প্রমাণ যে বেণুধর রাজখোয়ার ‘নোটস’ খুব একটা নির্ভর যোগ্য গ্রন্থ হতে পারে না। কোনো সিলেটি বইটি পড়ে সন্তুষ্ট হয়ে অসমিয়া হতে চাইবেন, এই সম্ভাবনা দূর অস্ত। সিলেট ইতিহাসের কোনো এক কালে খুব অল্প সময়, গৌড় গোবিন্দের রাজ্যের অধীনে ছিল বটে কিন্তু এর প্রাচীন নাম সমতট, হারিলেক,বঙ্গ এমন কি সরাসরি কামরূপ ছিল বললেও সহ্য করা যায়, গৌড় ছিল না কখনোই! রাম শব্দের সমাহার দেখিয়ে অসমিয়াদের সঙ্গে আত্মীয়তা দাঁড়ায় না কিছুতেই। গেল বছরের নোবেল জয়ী রসায়নবিদ বেঙ্কটরমন রামকৃষ্ণন থেকে শুরু করে শাক্ত বাঙালিদের পরম আদরের রামকৃষ্ণ পরমহংস অব্দি সবার সম্পর্কে তবে বলতে হয়, তাদের নামের সম্পর্ক অসমিয়া ভাষার সঙ্গে ‘অইন ভাষা গোষ্ঠীর লগত নহয়।’ আসাম পাড়া , আসাম পুর স্থাননাম থাকা এমন কোনো অসম্ভব নয়, এরকম ব্রহ্মপুত্র এলাকাতে ‘বঙালি পাড়া’, ‘বঙালমারা’ ইত্যাদি স্থান নাম প্রচুর রয়েছে। সুধর্মফা, জনকফা, রত্নফা ইত্যাদি ফা-প্রত্যয়ান্ত নাম সিলেটিদের মধ্যে কখনো কেউ শুনেনি। এ তিনি কোথায় পেলেন অনুসন্ধান করতে হবে। তেমনি করতে হবে কুয়রগড় বলে কোনো স্থান নাম আদৌ আছে কি না। ‘গোয়াইন ঘাট’ আছে মেঘালয় সীমান্তে। কিন্ত এটি দ্রুত উচ্চারণে য়-শ্রুতির নিদর্শন বলেই মনে হচ্ছে। ‘গোয়াইন’ ব্যাপক প্রচলিত শব্দ নয়।মেঘালয় সীমান্তের এই স্থান নামে গারো বা খাসিয়া উচ্চারণের প্রভাব থাকাও অসম্ভব নয়। অন্যথা সিলেটিরা /স/ কে /হ/ উচ্চারণ করে বটে কিন্তু শব্দের মাঝে থাকলে স্পষ্ট /শ/ উচ্চারণ করে— ‘গোঁসাই’ , বাঁশকান্দি। আদিতেও সর্বত্র /শ/ ধ্বনিটি বাদ দেয় না– সুনামগঞ্জ , সুরমানদী। ‘কুয়র’ সিলেটিতে প্রচলিত শব্দ নয় বলেই জানি। ‘হাজার’ একটি বিশুদ্ধ বাংলা শব্দ। (হাজার বছর ধরে পথ হাঁটিতেছি…; বনলতা সেন; জীবনানন্দ দাস।) অসমিয়া শব্দটি ‘হেজার’ । তার থেকেই অসমিয়া উপাধি “ হাজারিকীয়া বা হাজরিকা” চন্দ্রকান্ত অভিধান অনুযায়ী এই উপাধির ইতিহাস হলো , “আহোম রজার দিনর এহেজার কাঁরীর ওপরত থকা বিষয়ার উপাধি ।” এই থেকে বুঝি বুঝতে হবে, সিলেটের ‘হাজরকী’ অঞ্চল নামটি অসম থেকে গেছে! হাজার শব্দটিতো অসমীয়া বাংলা দুই ভাষাতেই এসছে ফারসী থেকে। বাংলাদেশের বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলার এক স্থাননামও হাজরকি। সেই বগুড়া জেলার সঙ্গে তবে অসমের কোনো সম্পর্ক নেই কেন? কাছাড়ের মুসলমানদের মধ্যেও ‘হাজারি’ উপাধি রয়েছে। ভুঁইয়া, বড়ভূঁইয়া, লস্কর, বড় লস্কর ইত্যাদির মতো এই উপাধিও কাছাড়ি রাজাদের আমলে প্রচলিত হওয়া সম্ভব।অসমিয়া ‘বড়ুয়া’ উপাধিটি আহোম রাজাদের দেয়া। বাংলাদেশে এদিক থেকে শব্দটি যায়নি। বরং আহোম রাজারাও বৌদ্ধ ঐতিহ্য থেকে শব্দটি পাওয়া সম্ভব। সিলেটি নয়, বরং চাটগেঁয়ে বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে বড়ুয়া বহুল প্রচলিত উপাধি। বাঙালি দিব্যেন্দু বড়ুয়া একজন বিশ্ব দাবা চ্যম্পিয়ন। সুকুমার বড়ুয়া, বেণীমাধব বড়ুয়া বাংলাদেশের খ্যাতনামা লেখক। চিত্রপরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়াকে বাঙালি বাঙালি বলেই চেনে। গোয়ালপাড়ার গৌরিপুরের এই রাজা যদিও বর্তমান অসমের লোক ছিলেন, তাঁর পৈত্রিক উপাধিটি আহোম রাজাদের থেকে পাবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। চট্টগ্রামের দিকে এগুলে ‘বড়ুয়া’শব্দযোগে আরো বহু স্থান নাম পাওয়া যাবে। সিলেট কাছাড়ে এক ধরণের মোটা শক্ত বাঁশের নাম ‘বড়ুয়া’, বরো ধানকেও অনেকে ‘বড়ুয়া’ ধান বলে। সংস্কৃতে শ্রেষ্ঠ অর্থে ‘বর’ অথবা ‘বুদ্ধ’ দুটো শব্দ থেকেই ‘বড়ুয়া’ এসে থাকতে পারে। উপেন রাভা প্রথমটির দিকে ইঙ্গিত করেন ।( অসমীয়া আরু অসমর তীব্বত -বর্মীয় ভাষা, পৃঃ৯৬) সিলেটি আর অসমিয়া উচ্চারণটি অবশ্যি একই । সিলেটিরাও ‘বরুয়া’ উচ্চারণ করেন। সম্ভবত পুব বাংলার কোনো উপভাষার মানুষই ‘বড়ুয়া’ লিখলেও উচ্চারণ করতে পারেন না। তার মানে ‘বড়ুয়া’ উপাধিটিকেও যদি আত্মীয়তা করতেই হয় তবে শুধু অসমিয়া সিলেটিতে কেন, গোটা পুব বাঙালিদের সঙ্গেই করবে। ‘বোকা’ (কাদা) আর ‘বগা’ (সাদা) শব্দদুটোর অসমিয়া অর্থও এক নয়। ‘বগাপানি’ যেমন অসমেও আছে, তেমনি আছে মেঘালয়েও। মেঘালয় পাহাড় থেকে বয়ে যাওয়া এক উপনদীর নাম ‘বগানদী’। ‘বগা’ শব্দটির সঙ্গে খাসিয়া ভাষার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা সেটি দেখা যেতে পারে। উপেন রাভা নিজেইতো দেখছি তাঁর বইতে ‘বগা’ শব্দের এক মালয় উৎসের সংবাদ দিচ্ছেন। বক, বিওগ। ( অসমীয়া আরু অসমর তীব্বত -বর্মীয় ভাষা, পৃঃ৬৭) মালয়েশিয়ার ভাষা মালয় একটি অস্ট্রিক ভাষা। সংস্কৃতে শব্দটি ‘বলক্ষ’, আহোমে পুক, রাভাতে বকা, গারোতে গিপক, লেপচাতে আ-বক (ঐ) । অবশ্যি এগুলো তাঁর মতে বিতর্কিত তথ্য। অর্থাৎ, আর্য ভাষা থেকে তিব্বত বর্মী ভাষাগুলোতে গেছে না, উল্টোটা হয়েছে এ নিয়ে সংশয় থেকে গেছে। বাংলা ‘বক’ পাখি নামের উৎসও এই মালয় কিম্বা ভোট বর্মী শব্দ কিনা এও ভাবা যেতে পারে। এই পাখি নাম থেকেও রঙ নামটি আসতেই পারে, পুরুষ ‘বক’ পাখিকে সিলেটিতে বলে , ‘বগা’, ( কাছাড়িতে) ‘বগুড়া’ । (‘ফান্দো পড়িয়া বগায় কান্দে রে !’) অসমিয়াতে পাখি নামটি ‘বগ’ এবং ‘বগলি’ । কিন্তু সবচে বিশ্বাসযোগ্য উৎসের সন্ধান চট্টগ্রামের বান্দরবানের কাছে বাংলাদেশের সবচে’ উঁচু উষ্ণ প্রস্রবণ বগাকাইন বা বগা লেক অব্দি গিয়ে পৌঁছুনো যেতে পারে। বগালেকের পাশে বম, মুরং বা ম্রো, তঞ্চংগ্যা এবং ত্রিপুরা ইত্যাদি ভোট বর্মী জনজাতীয়রা বাস করেন। স্থানীয় জনজাতীয় উপকথা অনুযায়ী, অনেক আগে ওখানে পাহাড়ের গুহায় একটি ড্রাগন বাস করতো। বম ভাষায় ড্রাগনকে বলে ‘বগা’ । ড্রাগন-দেবতাকে তুষ্ট করতে স্থানীয়রা গবাদী পশু উৎসর্গ করতেন। কিন্তু একবার কিছু লোকে মিলে এই ড্রাগন দেবতাকে হত্যা করলে চূড়াটি জলমগ্ন হ্রদে পরিণত হয় এবং গ্রামগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে। ভূতাত্বিকদের মতে ওখানে হয় কখনো কোনো আগ্নেয়গিরি ছিল , নতুবা প্রকাণ্ড উল্কাপাত হয়েছিল। তাতেই ঐ হ্রদ তৈরি হয়েছে। উপকথার আগুন উদগীরণকারী ড্রাগন বা বগার থেকে নাম পড়েছে ‘বগা হ্রদ’ । এই হ্রদের থেকেও একটি ছোট্ট ঝরণা নিচে নেমে গেছে তার নাম ‘বগাছড়া’। এর থেকে এটি বেশ স্পষ্টই বোঝা যায় তিব্বত বর্মী ভাষাগুলো থেকেই ‘বগা’ শব্দটি বাংলাতে এসে থাকবে । অসমিয়াতেও সেখান থেকেই এসে থাকবে। সিলেটির থেকে এর প্রচলন অসমিয়াতে বেশি। চাটগেঁয়ে বাংলাতে আছে কি না, আমরা জানি না।


জগন্নাথ চক্রবর্তী তাঁর অভিধানে ‘বগা’,’বগুড়া’ শব্দের সংস্কৃত ‘বক’ উৎসের উল্লেখ করেছেন। ‘-ড়া’টি তাঁর মতে স্বার্থিক প্রত্যয়। অভিধানটিতে তিনি ‘বরাক বাংলা’ শব্দগুলোর কুকিচিন বা ভোট বর্মী উৎস নিয়ে আশ্চর্য রকম নীরব। যেগুলোর মূল খুঁজে পান নি ‘অজ্ঞাত মূল’ বলে থেমে গেছেন। কিন্তু সংস্কৃত উৎস পেলে তিনি ভীষণ রকম সরব। সম্ভবত এই উদ্দেশ্যে যে তাতে উপভাষাটির একটি সম্মান আদায় করে নিতে পারবেন। এতে করে তিনি তাঁর পুরো শ্রমটিকেই এক সীমাতে বেঁধে দিয়েছেন । উপেন রাভা হাকাচামও এর পরে বাংলা-সিলেটি এবং অসমীয়ার এক দীর্ঘ তুলনা মূলক আলোচনা করেছেন। কিন্তু, কী মুস্কিল ! সিলেটি বলে তিনি যে শব্দ বাক্য গুলো তুলে দিয়েছেন তার সঙ্গে সম্প্রতি শারদীয়া আনন্দবাজারে’ প্রকাশিত সমরেশ মজুমদারের গল্প ‘ছায়া শরীরে’র সিলেটির মিল আছে। অর্থাৎ সেগুলোও বেশির ভাগ সময়ে সিলেটি নয়। তার চে’ও মজা হলো, বাংলা বলে তিনি যে শব্দবাক্যের উল্লেখ করেছেন সেগুলোও অতি বিশুদ্ধ বাংলা। অর্থাৎ ‘সাধু বাংলা’ নামের কৃত্রিম ভাষাটি। ওই ভাষাতে কেউ কথা বলে না। অবশ্যি তিনি যে এটি ইচ্ছে করে করেছেন তা নাও হতে পারে। গ্রীয়ার্সনের বিশাল গ্রন্থেও এই ত্রুটি ছিল। তাঁকে যে সিলেটিরা উপকরণ গুটিয়েছিলেন তাঁরা সেই দলের লোক যাদের সম্পর্কে সঞ্জীব লিখেছেন, “যারা সিলেটি বলেন অথচ শিষ্ট সমাজে এটা গোপন রাখতে চেষ্টা করেন।” গ্রীয়ার্সনের তুলে দেয়া একটা গল্পে অমন অদ্ভূত মজাদার সিলেটি বাক্য প্রচুর আছে , “… আর সে তাহারে হূয়র রাখিতে বন্ধে পাঠাইল” যেকোনো সিলেটিরও এমন বাক্য শুনে পেটে খিল ধরবে। এই ত্রুটি না বুঝেই উপেন রাভা ভেবেছেন , “যিহর দ্বারাই ই যে অসমীয়ারহে অতি ঘনিষ্ট তাক প্রমাণ করিব পরা যায়।” তাঁর এই দাবিটি মিথ্যে নয়, কিন্তু ‘অসমীয়া’ শব্দের পরে যুক্ত ‘-হে’ প্রত্যয়টি অর্থবহ। বেণুধর রাজখোয়ার মতো আসলে তিনিও বলতে চাইছেন , “বাংলা বা অইন ভাষা গোষ্ঠীর লগত নহয়।” আমরাও এর পরের অধ্যায়ে তাঁকে অনুসরণ করেই সেই চেষ্টাই করব। কিন্তু সিলেটিকে সিলেটি আর বাংলাকে বাংলা করে নিয়ে। অসমিয়াকে আমরা সেভাবেই রাখব যেভাবে তাঁর গ্রন্থে পাব। কিন্তু সে আলোচনা সম্ভবত নিরস হবে। কেননা , সেখানে থাকবে যত ধ্বনিতত্ব, রূপতত্ব, শব্দতত্ব আর বাক্যতত্বের কথা। আমরা চেষ্টা করব ‘শুষ্ক কাষ্ঠ’কে ‘নিরস তরুবর’ করে তুলতে।


গ্রন্থ সূত্রঃ

১)প্রসঙ্গ সিলেটি ভাষা; সঞ্জীব দেবলস্কর ;বাঙালনামা ঃ দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা ।
২) অসমীয়া আরু অসমর তিব্বত-বর্মীয় ভাষা ;ড০ উপেন রাভা হাকাচাম ।
৩)অসমীয়া আরু অসমর ভাষা উপভাষা।ঃ ঐ।
৪)ভাষার ইতিবৃত্ত; সুকুমার সেন।
৫)বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক বাংলা ভাষার অভিধান ও ভাষাতত্ব; জগন্নাথ চক্রবর্তী।
৬)ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ; পবিত্র সরকার।
৭)সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলাভাষা; রামেশ্বর শ’
৮ ) ভাষাতত্ব; অতীন্দ্র মজুমদার
৯)বাঙালির ইতিহাস-আদি পর্ব; নীহার রঞ্জন রায়।
১০)কাছাড়ের ইতিবৃত্ত; উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ।
১১)The Origin and Development of the Bengali Language; Suniti Kumar Chatterji.
১২)Linguistic Survey of India; G. A. Grierson; http://www.joao-roiz.jp/LSI/
১২) শব্দতত্ব ; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

About these ads

2 Responses to “অসমিয়া ভাষা, সিলেটি উপভাষা এবং অসমে ভাষাচর্চার রূপরেখা”

  1. গৌতম চৌধুরী said

    আমার তো ভাষাতত্ত্বের প্রথাগত শিক্ষা নেই, তবু এই লেখাটি পড়ে খুব ভালো লাগল। সিলেটির পটভূমিকায় ভাষাতত্ত্ব আর ভাষা-রাজনীতির দ্বন্দ্ব নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারলাম। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

  2. Subrata mazumdar said

    ধন্যবাদ স্যার। অনেক কিছু জানতে পারলাম…

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 62 other followers

%d bloggers like this: