বা ঙা ল না মা

দ্বান্দ্বিকতার রূপরেখা : সত্যজিৎ রায়ের ‘ক্যালকাটা ট্রিলজি’ এবং সমকালীন নীতি ও মূল্যবোধ

Posted by bangalnama on December 31, 2009



‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন অরণ্য’- সত্যজিৎ রায়ের ‘ক্যালকাটা ট্রিলজি’ সম্পর্কে লিখিত ও পঠিত বিশ্লেষণের সংখ্যা কোনোভাবেই কম নয়। পরিসরের স্বল্পতা এবং লেখকের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করেই বর্তমান রচনার শিরোনামটি ভাবা হয়েছে। নৈতিকতা
(ethics) এবং মূল্যবোধের (morality) সঠিক সংজ্ঞা নিরুপণ করা আজও পুরোপুরি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কাজটা আরো কঠিন হয়ে যায় যখন প্রেক্ষাপট হিসাবে থাকে সাহিত্য বা সিনেমার মত মাধ্যম, সমকালীন শব্দকোষ অনুযায়ী যাদের ‘high art’ বলা যেতে পারে। অতি সরলীকরণ দোষে দুষ্ট হওয়ার ঝুঁকিটুকু নিয়েই বর্তমান প্রবন্ধে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধকে দুটি সামান্য আলাদা আদর্শ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ফরাসি দার্শনিক ও নব্য ইতিহাসবাদের প্রবক্তা Michael Foucault-এর অনুকরণে বলা যেতে পারে – নৈতিকতা একপ্রকার সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মূল্যবোধের দায়বদ্ধতা ব্যক্তিবিশেষের কাছে। এই আপাত-সরল উক্তির মধ্যে অবশ্য এক গভীর ব্যঞ্জনার আভাস পাওয়া যায়। বিশেষ করে ১৯৮২ সালের রণজিত গুহ’র ‘সাবঅল্টার্ণ স্টাডিজ’-এর প্রচারের ফলে আমরা জেনেছি সামাজিক মানুষের অবস্থান কোনো স্বয়ংক্রিয় ঘটনা নয় – তা নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের আর্থসামাজিক অবস্থান, বড় হয়ে ওঠা, ভাষা আর নানাবিধ মানসিক আদান-প্রদানের উপর। যদিও সমাজবদ্ধ কোনো ব্যক্তিবিশেষই এই আবর্তের বাইরে নন, সত্যজিৎ রায় তাঁর ফিল্মগুলির মাধ্যমে এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে চেয়েছেন যাকে সেলফ-রিফ্লেক্সিভ বলা চলে। নিজের অবস্থানের অমোঘতাকে স্বীকার করেই সত্যজিৎ তাঁর চরিত্রগুলির মাধ্যমে সেই অমোঘতার কারণগুলি দেখাতে চান। বর্তমান প্রবন্ধের দ্বিতীয় ও শেষ পয়েন্টগুলিও এই সেলফ-রিফ্লেক্সিভিটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সত্যজিতের ছবিতে ভিক্টোরিয়ান এবং আধুনিক মূল্যবোধের দ্বান্দ্বিক অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট, এবং সাধারণ বিনোদনের সীমানা ছাড়িয়ে ক্যালকাটা ট্রিলজি এভাবেই হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ এক সামাজিক দলিল যা স্রষ্টা, চরিত্র এবং পাঠক – এই তিন গোষ্ঠিকে সচেতন করে দেয় তাদের অবস্থানগত সীমাবদ্ধতা এবং দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কে। বিভিন্ন চমকপ্রদ সিনেম্যাটিক প্রযুক্তির সাহায্যে ‘সীমাবদ্ধ,’ ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ এবং ‘জন অরণ্য’ আমাদের এই উপলব্ধির মুখেই দাঁড় করিয়ে দেয়।

We know that things and people are always forced to conceal themselves, have to conceal themselves when they begin. What else could they do? They come into being within a set which no longer includes them, in order not to be rejected, have to project the characteristics which they retain in common with the set. The essence of a thing never appears at the outset, but in the middle, in the course of its development, when its strength is assured. (Deleuze, 3)


ফরাসি তাত্ত্বিক
Deleuze-এর উপর্যুক্ত মতামত অনুযায়ী, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে আবদ্ধ ব্যক্তিবিশেষ সর্বদাই নিজেকে লুকোতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই আত্মগোপন চিরস্থায়ী নয়। মানুষের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ নীতির আবরণ সরিয়ে প্রকাশিত হতে বাধ্য, কিন্তু তা ঘটে একমাত্র আত্মিক উন্নতির হাত ধরে – Deleuze বলেন। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র সিদ্ধার্থের ক্ষেত্রেও এমনই ঘটে থাকে। ‘সিদ্ধার্থ’ নামের ব্যবহারটি একটি গূঢ় আইরনি হিসাবে দেখা যেতে পারে, কারণ ১৯৭২ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে শিক্ষিত যুবক সিদ্ধার্থ নিজের মোক্ষ সম্বন্ধে অনিশ্চিত। তার আপাদমস্তক মধ্যবিত্ত নীতিবোধ তাকে কলকাতার জনসমুদ্রে শুধু আরেকটি সংখ্যা হিসাবে মিশে যেতে বাধ্য করে। ক্রমাগত প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত হওয়া সত্তেও সে সমকালীন বুর্জোয়া সমাজের নিয়মনীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে অসমর্থ হয়। (প্রসঙ্গত সিদ্ধার্থের ছোট ভাইয়ের কথাও বলা যেতে পারে, যে আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। তার সশস্ত্র বিপ্লবের প্রতি একনিষ্ঠতাকে সত্যজিৎ কোনো পক্ষপাতপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করেননি কারণ বুর্জোয়া সমাজের অপর পিঠ হিসাবে যে অনিশ্চয়তা এবং সংশয়ের বাতাবরণ তিনি তৈরি করেছেন, তা কোনো অর্থেই ‘সীমাবদ্ধ’তাকে অতিক্রম করতে পারে না।)


সৌমেন্দু রায়ের চিত্রগ্রহণ এই দ্বান্দ্বিকতাকে সঠিকমাত্রায় পূর্ণতা প্রদান করে। দর্শক বারবারই সম্মুখীন হন সিদ্ধার্থর মূল্যবোধজনিত রাগ, আবেগ ও ঘৃণার সঙ্গে এবং একাধিকবার সাধারণ ফিল্ম স্টকের জায়গায় নেগেটিভ ফিল্টারের ব্যবহার করে সত্যজিৎ রায় বুঝিয়ে দেন যে সিদ্ধার্থর ‘অবস্থান’জনিত দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি বড় ধরণের পরিবর্তন আসন্ন। দর্শকরা সিদ্ধার্থর বোনের সহকর্মীকে হত্যার দৃশ্য দেখতে দেখতে তুঙ্গমুহূর্তের বিস্ফোরণের জন্য নিজেকে তৈরি করে নেওয়ার সময় পান, যদিও দৃশ্যটি প্রকৃতপক্ষে কাল্পনিক। একজন ফিল্ম পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হলে আরো একটি জটিলতর দ্বান্দ্বিক অনুষঙ্গের কথা বলাও প্রয়োজন হয়ে পড়ে। নীতিবোধ ও মূল্যবোধের টানাপোড়েনকে সত্যজিৎ রায় একটি গাঢ়তর বর্ণ প্রদান করেন, বিশেষত শারীরিক ব্যঞ্জনা সমৃদ্ধ দৃশ্যগুলিতে। সিদ্ধার্থ এবং তার বোনের সম্পর্কে নিশ্চিতভাবেই ইডিপাস গুঢ়ৈষণার ছায়া রয়েছে। এর থেকেও জোরালো সিদ্ধার্থর বন্ধুর নিভৃত আস্তানার দৃশ্যটি। বন্ধুর প্রতি সিদ্ধার্থর আকর্ষণ সহজবোধ্য – সামাজিক নীতিবোধ এবং মাঝারিয়ানাকে মুহূর্তে উড়িয়ে দেওয়া এই বন্ধুটি যেন সিদ্ধার্থরই অ্যান্টিথিসিস। কিন্তু সিদ্ধার্থর অন্তরীণ দ্বান্দ্বিকতা দর্শকের সামনে চলে আসে স্বল্পবাস মেয়েটির সিগারেট ধরানোর দৃশ্যে। সত্যজিৎ কোনো এক মুহূর্তেই নীতিবোধ এবং মূল্যবোধের আপেক্ষিক দ্বন্দ্বকে দাঁড় করিয়ে দেন এক বৃহত্তর দ্বন্দ্বের সামনে, যা সিদ্ধার্থর সামাজিক অবস্থান এবং মানুষের আদিম প্রবৃত্তির মধ্যে সবসময়ই অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। এই একটি দৃশ্যের মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারি সত্যজিৎ তাঁর সমকালীন মানুষের সবরকমের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেই সচেতন ছিলেন।

“The city by nature is capable of containing, without loss of credibility, an infinity of fictional characters and events. This is because a city is experienced as a space inhabited by a population, whose numbers can be counted more or less accurately, but whose mutual relationship cannot be easily specified. In urban spaces, individuals encounter each other as strangers, reified entities, whose position in a social network cannot be known immediately.” (Madhav Prasad, 125)


শহুরে জীবনের অন্তর্দ্বন্দ্ব সম্পর্কে সত্যজিতের আর্গ্যুমেন্ট পরবর্তী দুটি ছবিতে (‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’) কিছুটা হলেও অন্যভাবে এগোয়। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র সিনেম্যাটিক ভাষা যেখানে নীতি ও মূল্যবোধের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের একটি সুস্পষ্ট উপসংহার টানতে সক্ষম, ট্রিলজির বাকি অংশে সত্যজিৎ যেন কিছুটা অনিশ্চিত –
“This is because a city is experienced as a space inhabited by a population, whose members can be counted more or less accurately but whose mutual relationship cannot be easily specified.” সিদ্ধার্থের সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত প্রতিবাদ এখানে অনুপস্থিত, চরিত্রগুলি ethicsmorality’র দ্বন্দ্বকে আত্মস্থ করেই বেঁচে থাকে। ‘সীমাবদ্ধ’র উঠতি বিপণি আধিকারিক শ্যামল তার উচ্চাশার মইয়ে চড়বার সময় দ্রুত ফেলে দিতে চায় তার মধ্যবিত্ত নীতিবোধ, (লক্ষণীয় এই যে নীতি ও মূল্যবোধের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের উৎস সত্যজিতের ছবিতে সর্বদাই মধ্যবিত্ত প্রেক্ষাপট। এর কারণ কি পরিচালকের নিজস্ব আর্থসামাজিক জীবনের প্রভাব?) কারণ পুঁজিবাদী আর্থসামাজিক ব্যবস্থার বেগবান এবং আকর্ষণীয় দিকটি (আবারও বলতে হয় সৌমেন্দু রায়ের চিত্রগ্রহণ, তৎসহ দুলাল দত্তের সম্পাদনার কথা। জাম্প কাট, ফ্রীজ ফ্রেম এবং চরিত্র পরিচিতির ক্ষেত্রে স্পেশাল এফেক্টের ব্যবহারে সম্ভবত সত্যাজিৎ ভারতবর্ষে অগ্রণী, এবং পরবর্তীকালে এই প্রযুক্তি কোয়েন্টিন টারান্টিনো, গাই রিচি’র মত পরিচালকদের হাতে অন্য মাত্রা পেয়েছে) ক্রমাগত তার মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে চলেছে। টুটুলের আবির্ভাব এক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে শ্যামলের আহরণের মরাল অ্যান্টিথিসিস মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে টুটুল মূলতঃ দর্শকের বিবেকের ভূমিকাতেই আবদ্ধ থাকে, কারণ সে না এলেও ঘটনাপ্রবাহ কমবেশি অপরিবর্তিত থাকত। বরং এক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ শ্যামলবেশী বরুণ চন্দর নিপুণ অভিনয় – কারখানায় উত্তেজনা সৃষ্টির পরিকল্পনা করার সময় বারবার চোয়াল শক্ত করা বা চোখের পাতা ফেলার সুদক্ষ ডিটেলিং। এছাড়া ছবির শেষ দৃশ্যটিও স্মর্তব্য, যেখানে টুটল চলে যাওয়ার পর শ্যামল নিজের হাতের মধ্যে মুখ লুকিয়ে একা বসে থাকে। শ্যামল লজ্জিত কিন্তু শ্যামল ফিরে আসবে না। প্রায় একইরকম পরিস্থিতির উদ্ভব হয় ‘জন অরণ্য’র ক্ষেত্রে, যেখানে সোমনাথ বেছে নেয় ‘দালালি’র রাস্তা। শব্দটির আভিধানিক অর্থ সত্যজিতের কাছে অপ্রয়োজনীয়, এর অর্থ নিহিত আছে মধ্যবিত্ত নীতিবোধের মোটিফের মধ্যে। সুকুমারের বোনকে শিল্পপতির কাছে পৌঁছে দেওয়ার গ্লানি সোমনাথ যদিও বহন করে নিয়ে চলে, শেষ দৃশ্যে সোমনাথের বাবার একা বসে থাকার দৃশ্যটি দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বর্তমান জীবনের সারমর্মই এই দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে বেঁচে থাকা, মধ্যবিত্ত নৈতিক আদর্শ এখন অতীতের বিষয়। সত্যজিতের তৃতীয় এবং শেষ ছবি হিসাবে ‘জন অরণ্য’ এভাবেই আলোচনার একটি দ্ব্যর্থক উপসংহার টানে, যা কিনা ক্ষেত্রবিশেষে বিতর্কের সাময়িক পরিসমাপ্তি হিসাবেই দেখা যেতে পারে।


গ্রন্থপঞ্জী –
১।
Bhadra, Goutam, and Ranajit Guha, eds. Nimnoborger Itihash. Kolkata: Ananda Private Limited, 1998. Print.
২।
Deleuze, Gilles. Cinema. Vol. 1. Harrisburg: Continuum. Print.
৩।
Madhav Prasad, M. “Realism and Fantasy in Representations of Metropolitan Life of Indian Cinema.” City Flicks. Seagull. Print.


লিখেছেন – দিব্যকুসুম রায়

3 Responses to “দ্বান্দ্বিকতার রূপরেখা : সত্যজিৎ রায়ের ‘ক্যালকাটা ট্রিলজি’ এবং সমকালীন নীতি ও মূল্যবোধ”

  1. Caesar said

    “দর্শকরা সিদ্ধার্থর বোনের সহকর্মীকে হত্যার দৃশ্য দেখতে দেখতে তুঙ্গমুহূর্তের বিস্ফোরণের জন্য নিজেকে তৈরি করে নেওয়ার সময় পান, যদিও দৃশ্যটি প্রকৃতপক্ষে কাল্পনিক।”

    Bhodrolok Siddhartha’r bon-er shudhui sohokormi non, borong immediate oporwala chhilen. Sei jonyei Siddhartha’r mone exploitation fantasy ebong tojjonito aakrosh oto tara-tari bere uthte perechhilo.

    Bhalo likhechhish, Dibyo.🙂

  2. আকাশ said

    ভালো লেখা । লেখাটা পড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী নামাতে হলো ।

  3. basu acharYa said

    “raam naam satYa he” !!😀

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: