বা ঙা ল না মা

‘খেলতে হলে প্রপার মোহনবাগান একাদশেই খেলবো, ওদের জুনিয়র টিমের হয়ে নয়’

Posted by bangalnama on December 31, 2009


কে না জানে বাঙালের অস্তিত্বের একটা বলিষ্ঠ উচ্চারণ ইস্টবেঙ্গল ফুটবল ক্লাব। এই স্বরটিকে সম্মান জানিয়ে বাঙালনামা শুরু করলো ইস্টবেঙ্গল-সিরিজ। অতীত ও বর্তমানের ইস্টবেঙ্গল মহারথীদের নিয়মিত সাক্ষাৎকার প্রকাশের পরিকল্পনা থাকলো। এই সংখ্যায় রাখা হলো বাংলা ফুটবলের স্বর্ণোজ্জ্বল ষাটের দশকের বিখ্যাত ফুটবলার সুকুমার সমাজপতির সাক্ষাৎকারের প্রথম ভাগটি। বাঙালনামার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনির্বাণ দাশগুপ্ত


বাঙালনামা।। আপনার ছোটবেলার কিছু কথা বলুন-


সুকুমার সমাজপতি।। আমাদের আদি বাড়ি, অর্থাৎ আমার বাবার ছোটবেলা কেটেছে ফরিদপুরে। আমার নিজের জন্ম মামাবাড়িতে, পাবনা জেলার রতনগঞ্জ গ্রামে। আমার বেড়ে ওঠা এরপর থেকে কলকাতাতেই, ছোটবেলায় সাউথ সাবার্বান ইস্কুলে ভর্তি হই। সেখান থেকে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট উত্তীর্ণ হয়ে আশুতোষ কলেজে জিওলজি নিয়ে পড়াশোনা করেছি।


বাঙালনামা।। আপনার বাড়িতে কি খেলাধুলোর পরিবেশ ছিল? খেলার প্রতি আগ্রহ কি বাড়ির থেকেই পাওয়া?


সুকুমার সমাজপতি।। দ্যাখো, বাড়ির কথা বলতে গেলে বলতে হয়, সেদিক থেকে আমি ভীষণ ভাগ্যবান ছিলাম, খেলাধুলো এবং সংস্কৃতি-চর্চার দু’টো ধারাই আমাদের বাড়িতে সমান্তরালে বইতো। আমার বাবা, স্বর্গীয় কালিপদ সমাজপতি খুব ভালো আঁকতেন। এই যে দেওয়ালে অয়েল-পেইন্টিংগুলো দেখছো, এইগুলো ওঁর-ই আঁকা। তার সঙ্গেই উনি ফার্স্ট ডিভিশনে কালিঘাটের হয়ে ফুটবলও খেলতেন। আমার ঠাকুরদা, স্বর্গীয় নিবারণচন্দ্র সমাজপতি ছিলেন সেযুগের বিখ্যাত কীর্তন-গাইয়ে। কাকারাও খেলাধুলোয় উৎসাহী ছিলেন… তাই, খেলাধুলো নিয়ে উৎসাহ আমি বাড়ির সবার কাছ থেকেই পেয়েছি।


বাঙালনামা।। তার মানে তো ফুটবলে আপনার ‘পায়ে-খড়ি’ খুব কম বয়সেই! আচ্ছা, ছোটবেলায় মাঠে খেলা দেখতে যাবার কোনও স্মৃতি আছে?


সুকুমার সমাজপতি।। এইখানে একটা মজার কথা বলি- কলকাতার মাঠে যত ফুটবলার খেলেছেন বা খেলছেন এখনও, তাঁরা কেউই আমার চেয়ে ছোট বয়সে ময়দানে খেলা দেখতে গিয়েছেন বলে মনে হয় না। কাকার কোলে চেপে, আমার যখন তিন-চার বছর বয়স, তখন থেকেই মাঠে ফুটবল দেখতে গেছি! তখন এখনকার ডালহৌসি মাঠে গ্যালারি ছিল, এখনও মনে আছে।


ফুটবলের ওপর ভালোবাসা কেমন ছিল, বলি। একটু বড়ো যখন হয়েছি, আমাদের পাড়ায়, মানে কালিঘাটে, পার্পিচুয়াল ক্লাব ছিল – সেখানে খেলতাম। তাছাড়া প্রেসিডেন্সি জেল মাঠে রোজ বিকেলে নিয়ম করে খেলতে যেতাম। কোনওদিন কয়েদি পালালে বা জেল-এ গন্ডগোল হলে সেখান থেকে দৌড়ে লইয়ার’স কলেজ মাঠ।


এদিকে বাড়িতে কড়া নিয়ম, ছ’টার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হবে। অতএব খেলা শেষ হলেই দৌড়ে বাড়ি ফিরতাম। অনেকদিন হয়েছে, আমি আর আমার টিচার, যিনি সন্ধ্যেবেলা পড়াতে আসতেন, একসঙ্গে বাড়ি ঢুকছি!


বাঙালনামা।। প্রতিযোগিতা-মূলক টুর্নামেন্টে খেলাও নিশ্চয়ই পাড়ার ক্লাবের হয়েই প্রথম?


সুকুমার সমাজপতি।। হ্যাঁ সে তো বটেই। পারিবারিক ভাবে ইয়ং বেঙ্গল ছিল আমাদের ক্লাব। তাছাড়াও যেটা বলার, সে সময়ে প্রচুর আন্ডার পাঁচফুট হাইটের টুর্নামেন্টে খেলেছি। তখন নিউ আলিপুরে অনেক বড় বড় মাঠ ছিল। সেখানে এরকম আন্ডার পাঁচফুট টুর্নামেন্টগুলো হতো। মনে আছে ১৯৫৩-তে এরকম সাতাশটা টুর্নামেন্ট-এর ফাইনাল খেলে উনিশটায় ‘বেস্ট-ম্যান’ হয়েছিলাম। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ কথাটা তখনও চালু হয়নি, ম্যাচের সেরাকে বেস্ট ম্যান বলা হতো


সেই সময়ে ইন্টার-স্কুল ম্যাচগুলোতে কিন্তু হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতো। আমার জীবনে প্রথম স্কুল-ম্যাচ ক্লাস এইটে মিত্র স্কুলের এগেইন্সটে। ওদের সঙ্গে আমাদের বরাবরই একটা রেষারেষি ছিল। ম্যাচে আমার দেওয়া একমাত্র গোলে আমরা জিতেছিলাম।


বাঙালনামা।। ময়দানে ক্লাবের হয়ে প্রথম ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা কিরকম ছিল?


সুকুমার সমাজপতি।। আমাদের বাড়ির সবাই কোনও না কোনও সময়ে ইয়ং বেঙ্গল ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। তা, সেই ক্লাবের প্রাণপুরুষ ছিলেন কৃষ্ণধর বন্দ্যোপাধ্যায়, কেষ্টদা নামেই তাঁকে সবাই চিনতো। ১৯৫৫-তে, যখন আমার ১৫ বছর বয়স, আমাদের বৈঠকখানা ঘরে আড্ডা হতে হতে, কেউ একজন, আমার বাবা-ই বোধহয়, কেষ্টদা-কে বলেছিলেন, আমাকে ইয়ং বেঙ্গলে খেলানোর কথা। সেই মরসুমে ইয়ং বেঙ্গল থার্ড ডিভিশনে খেলতো।


এখনো মনে আছে, কেষ্টদা বলেছিলেন- ‘এখনো ও বড্ডো ছোট রে, পারবে না’। যাই হোক, পরে সেই বছরেই খেলতে শুরু করি। সে-বছর ১৪টার মধ্যে ৯টা ম্যাচ খেলেছিলাম এবং বেশ ভালোই খেলেছিলাম।


বাঙালনামা।। আচ্ছা আপনার সময়ে ইন্টার কলেজ ফুটবলেরও তো খুব রমরমা ছিল। ময়দানে লিগ ম্যাচ খেলার পাশাপাশি তার অভিজ্ঞতাও কিছু বলুন-


সুকুমার সমাজপতি।। হ্যাঁ তখন ইন্টার কলেজ ম্যাচগুলোতে যাঁরা খেলতেন, পরে তাঁদের অনেকেই বড় ক্লাবে খেলেছেন। ফলে এই ম্যাচগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানও খুব উঁচু থাকতো। আশুতোষ কলেজের হয়ে সে বছরে আমি ৪ থেকে ৫টা হ্যাট্ট্রিক করেছিলাম। তখন এই কলেজম্যাচগুলির রিপোর্ট সমস্ত সংবাদপত্রে বার হতো। সেবছর এলিয়ট শিল্ডে ল’ কলেজের সঙ্গে আমাদের ফাইনালে দেখা হয়। ল’ কলেজের তখন দুর্দান্ত টিম, বেশ কয়েকজন ইন্ডিয়া প্লেয়ার আছেন। সেই ম্যাচে আমরা ১-০ জিতি। গোল করেছিলেন দীপক মিত্র।


বাঙালনামা।। আপনি তো ১৯৫৯-এ এরিয়ান-এর হয়ে খেলতে শুরু করেন, তাই না?


সুকুমার সমাজপতি।। তার আগে আর একটা গল্প বলি। ১৯৫৮ সালে আমি যখন ইয়ং বেঙ্গল-এর হয়ে সেকেন্ড ডিভিশন খেলছি তখন বলাইদাস চ্যাটার্জী আমাকে জুনিয়র মোহনবাগানে খেলার প্রস্তাব দেন। ক্লাবের নাম দেখে আমার বাবা আগ্রহী হলেও আমি প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করি। বাবাকে বলেছিলামঃ ‘খেলতে হলে প্রপার মোহনবাগান একাদশেই খেলবো, ওদের জুনিয়র টিমের হয়ে নয়।’


সে বছরেই ইঊরোপিয়ান বনাম ইন্ডিয়ানদের খেলায় আমার করা একমাত্র গোলে ইন্ডিয়ানরা জেতে।


১৯৫৯-এ আমার কাছে এরিয়ান এবং খিদিরপুর দুটো ক্লাবের থেকেই ফার্স্ট ডিভিশনে খেলার অফার ছিলো। ঐতিহ্যশালী বলে আমি এরিয়ানে খেলা মনস্থ করি। তখন বাসভাড়া বাবদ মাসে ১৫ টাকা করে পেতাম আর ক্যান্টিনে রোজ ৪ আনার খাবার ফ্রি ছিল।


বাঙালনামা।। ফার্স্ট ডিভিশনে প্রথম মরসুম খেলা নিশ্চয়ই মনে আছে?


সুকুমার সমাজপতি।। আমাদের প্রথম ম্যাচ ছিল ইস্টার্ন রেলওয়েজের সঙ্গে। ওদের তখন সাংঘাতিক টিম। আর এরিয়ানে আমি, মঙ্গল পুরকায়স্থ সমেত বেশ কিছু নতুন মুখ। মনে আছে দুর্দান্ত খেলেছিলাম। ম্যাচটা ড্র হয়েছিল। পরের দিন স্টেটসম্যানে সিডনি ফ্রিস্কিন রিপোর্ট করেন-‘ Of the new recruits Samajpati shows extensive dash in his moves’। তখনও আমি কিন্তু সেন্টার ফরোয়ার্ডে খেলি।


সেবারই ইস্টবেঙ্গলের এগেইন্সটে আমাকে বলা হয় রাইট উইং-এ খেলতে। আমি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করি। মাঠ থেকে সোজা বাড়ি চলে আসি। পরের তিনটে ম্যাচে মাঠ-মুখো হইনি। পরে এরিয়ান ক্লাবের সন্তোষ মুখার্জী সেন্টার ফরওয়ার্ডেই খেলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান।


রিটার্ন লেগ-এ ইস্টার্ন রেলওয়ের সঙ্গে এক গোলে জিতি। মোহনবাগান ম্যাচে পেনাল্টি বক্স-এর মধ্যে জার্সি টেনে ধরে ওদের ডিফেন্ডার। তা, মোহনবাগানের এগেইন্সটে তখন ছোটখাটো পেনাল্টি ডিসিশন দেওয়া হতো না। রেফারির বদান্যতায় সে যাত্রা ম্যাচটা ড্র হয়।


তখন একই সঙ্গে ইন্টার ইউনিভার্সিটির ম্যাচগুলো খেলছি। ফাইনালে ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটির কাছে ১-০ হারি।


কলকাতা লিগের ম্যাচে আমি ধারাবাহিক ভাবে ভালো খেলতে থাকি। এর মধ্যে মোহনবাগানের হয়ে লিয়েন-এ রোভার্স কাপ খেলতে যাই, কিন্তু কোনও ম্যাচই খেলার সুযোগ পাইনি। সামনে ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা ছিল, পড়াশোনাও তেমন করতে পারিনি, অতএব একই ভাবে ডুরান্ড কাপ খেলার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিই।


বাঙালনামা।। ১৯৬০ থেকেই তো বড় ক্লাবে খেলছেন?


সুকুমার সমাজপতি।। হ্যাঁ, ১৯৬০-এর এক সকালবেলায় শৈলেন মান্না আর বলাইদাস চ্যাটার্জী দুজনে আমার বাড়িতে মোহনবাগানে খেলার প্রস্তাব নিয়ে আসেন। সেই আমার মোহনবাগান দিয়ে বড় ক্লাবে খেলার শুরু। সেদিন পারিশ্রমিকের কথা মুখ ফুটে বলতে পারিনি ওঁদের। পরে, কলেজে পড়ার খরচা বাবদ মাসে ১০০ টাকা করে পেতাম।


১৯৫৯-এ আমার ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা দেওয়া হয়নি খেলার কারণে। ১৯৬০-এ, আমাদের লিগ-এর দ্বিতীয় ম্যাচ ছিল বিএনআর-এর সঙ্গে। ঠিক সেইদিনই আমার ফিজিক্স পরীক্ষা দু’টো থেকে পাঁচটা। মান্নাদা বললেনঃ ‘সাড়ে চারটের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করতে পারবি? নিচে গজু বোসের গাড়ি থাকবে, তাতে উঠে সোজা মাঠে চলে আসবি’। ভাগ্যক্রমে সেবার প্রশ্ন ভালো হয়েছিল। পরীক্ষা শেষ করে গজুবাবুর গাড়িতে সোজা মাঠে গিয়ে খেলতে নামি। ম্যাচটা আমরা ২-১ এ জিতি। আমি একটা গোল কর। তখনও সেন্টার ফরওয়ার্ডেই খেলি।


বাঙালনামা।। বড় ক্লাবের সদস্য-সমর্থকদের চাপটা কি তখন বুঝতে শুরু করেছেন?


সুকুমার সমাজপতি।। এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি শোনো। আমি নিজের খেলায় সেই মরসুমের শুরুতে মোটেই সন্তুষ্ট ছিলাম না। খুব খেটে খেললেও কোথায় যেন একটা খামতি থেকে যাচ্ছিল। লিগের তৃতীয় ম্যাচে রাজস্থানের সঙ্গে আমরা ড্র করলাম। ফিরতে ফিরতে শুনি, সদস্য সমর্থকরা বলছে-‘এই সব রাষ্ট্রপতি-সমাজপতি দিয়ে ফুটবল হবেনা।’ খুব মনখারাপ হয়েছিল জানো। তখনও একদমই অনভিজ্ঞ তো!


বাঙালনামা।। সে মরসুমের কোনও উল্লেখযোগ্য ঘটনা?


সুকুমার সমাজপতি।। লিগের ষোল নম্বর ম্যাচে ইস্টার্ন রেলওয়ের সঙ্গে খেলাতে আমি ডান হাঁটুতে চোট পাই। দু’মাসের জন্যে বাইরে থাকতে হয়েছিল। অসম্ভব খারাপ লেগেছিল বড় ক্লাবে খেলার শুরুতেই এরকম চোট পাওয়াতে। কেরিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছিলাম।


একবার প্রথম একাদশ থেকে দু’মাসের জন্যে বেরিয়ে গেলে, ফিরে জায়গা করে নেওয়াটা তখন সহজ ছিল না। প্র্যাকটিসে পাগলের মতো খেটেছি। সুযোগ এলো আইএফএ শিল্ডে। মহামেডানের সঙ্গে সেমিফাইনাল। আমাকে বলা হল লেফট উইং-এ খেলতে, আমি তখন তাতেও রাজি, প্রথম এগারোয় ঢুকতে পারলেই ভালো খেলবো এরকম একটা আত্মবিশ্বাস ছিল। মাঠে নামার আগে অরুণ সিনহা বললেন – ‘খেলে ২০ মিনিট পরে বেরিয়ে আসবে, তোমার জায়গায় সুনীল ঘোষ ঢুকবে’। জীবনে প্রথম এরকম কথা শুনলাম! অরুণবাবুকে বলেছিলামঃ ‘এরকম ভাবে একটু পরেই বেরিয়ে এলে লোকে ভাববে আমার হাঁটু শেষ হয়ে গেছে। তার চেয়ে বরং মাঠেই নামবো না’। জার্সি খুলে দিয়ে ক্লাব টেন্টের ভিতরে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলাম সেদিন। ভাসিয়া মালির কথা মনে পড়ে, আমাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে গায়ে হাত বুলিয়ে বলেছিল- ‘মনখারাপ কোরোনা। আমি যদি একটুও ফুটবল বুঝে থাকি সমাজবাবু, তুমি একদিন অনেক নাম করবে।’


বাঙালনামা।। তারপর কি লিগে খেলেছিলেন?


সুকুমার সমাজপতি।। না, সেদিন রাতেই মিথিলা এক্সপ্রেস করে ইন্টার ইউনিভার্সিটি ম্যাচ খেলতে গোরখপুর চলে যাই। মান্নাদার কাছ থেকে পার্মিশন নিয়ে গিয়েছিলাম। মান্নাদার আমাকে আটকানোর মতো মুখ ছিলনা সেদিন। ওখানে জোনাল ফাইনালে পাটনা ইউনিভার্সিটিকে ১-০ গোলে আমরা হারাই। গোল করেছিলাম আমিই।


বাঙালনামা।। সেসময়ে আপনার আইসাইট নিয়ে একটা বিতর্ক উঠেছিল, তার কথা যদি আমাদের একটু বলেন-


সুকুমার সমাজপতি।। ওইসময়ে এবং তার পরে পরেই রোভার্স কাপের সময়ে, মোহনবাগান ক্লাবের একটি গোষ্ঠী থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ময়দানে রটানো হতে থাকে আমার চোখে ভালো দেখতে না পাওয়ার কথা। বলা বাহুল্য আমার কেরিয়ারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবার এই উদ্দেশ্য তখন সফল হয়নি।


বাঙালনামা।। সে বছর রোভার্সে কী হল?


সুকুমার সমাজপতি।। তার আগে একটা কথা বলি। অনেকেরই ধারণা যে আমি মূলতঃ ডান পায়ের প্লেয়ার। তা কিন্তু নয়। আমার বাঁ-পা আরও বেশি অ্যাগ্রেসিভ এবং অ্যাটাকিং ছিল। এরিয়ান থেকেই আমার বাঁ-হাঁটুতে একটা সমস্যা দেখা দেয়, যার ফলে আমি যথাসম্ভব ওই পা-কে কম ব্যবহার করার চেষ্টা করতাম মাঠে।


রোভার্সে প্র্যাকটিসের সময় বাঁ-হাঁটুতে চোট পেলাম। মাঠ থেকে বেরিয়ে এলাম গোড়ালি ধরে, যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে লেগেছে আসলে হাঁটুতে। আমার রুমমেট ছিলেন সনৎ শেঠ। তখন টিমের বড়রা কিরকম ভাবে ছোটদের আগলে রাখতেন দেখো, সনৎদা বুঝতে পেরেছিলেন আমার হাঁটুতে লেগেছে, ঘরে ফিরে সারারাত আমার হাঁটুর পরিচর্যা করলেন। পরের দিন সকালে হোটেলের করিডরে দৌড়ে দেখলাম, লাগছে না।


গোটা টুর্নামেন্টটা ডান পায়ে খেললাম, প্রথম ম্যাচেই গোল করলাম। সেমিফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের কাছে আমরা ১-০ হেরে গেলাম। সেবছরই ডুরান্ডে আমরা ইস্টবেঙ্গলের সাথে যুগ্মভাবে জয়ী হলাম।


বাঙালনামা।। তা পরের বছরই তো আপনি ইস্টবেঙ্গলে এলেন। এই দলবদলের গল্পটা একটু বলুন না-


সুকুমার সমাজপতি।। সেটার ব্যাকগ্রাউন্ডটা একটু দিয়ে দিই, তাহলে বুঝতে সুবিধে হবে। ক্লাবের মধ্যে তখন একটা গ্রুপ আমার পেছনে লেগেছিল।, সেই পরিবেশ আর ভালো লাগছিল না, এর মধ্যে রোভার্সে আমার খেলা বেচু দত্তরায়ের চোখে লেগেছিল, ফলে আমি সন্তোষ ট্রফিতে বাংলার হলে সে বছরে খেলার সুযোগ পেলাম। সে বছর সন্তোষ ট্রফি ছিল কালিকটে, গোটা বাংলা দল প্লেন-এ করে গেল। বিকেলবেলায় গজু বোস আমার বাড়িতে ট্রেনের টিকিট নিয়ে উপস্থিত হলেন। মুখের ওপর জানিয়ে দিলাম টিকিট ফেরত নিয়ে যেতে, যদিও এর পরে পরেই আমার জন্যেও প্লেনের টিকিটের ব্যবস্থা হয়। ঠিক করে নিলাম এর পরে আর মোহনবাগানে খেলার প্রশ্নই নেই।


সন্তোষ ট্রফির ফাইনালে আমরা সার্ভিসেসের কাছে ১-০ হারলাম।


ওখান থেকে ফিরে এসে ক্লাবের হয়ে ইস্ট আফ্রিকা টুর ছিল। আমি তখন মানসিক ভাবে আর মোহনবাগানের হয়ে খেলার অবস্থায় নেই, তাই, নীতির প্রশ্নে ক্লাবের পয়সায় ইস্ট আফ্রিকা যেতে মনের সায় পাচ্ছিলাম না। যেদিন সকালে টুর-এর জন্যে মেডিকেল টেস্ট ছিল, আমি ইচ্ছে করেই গরহাজির রইলাম। বিকেলে পাড়াতে আড্ডা মারছি, গজু বোস আর মান্নাদা এসে হাজির। জিগ্যেস করলেন সকালে কেন ক্লাবে যাই নি- আমি বললামঃ ‘আপনারা যান, একটু পরে যাচ্ছি’। মান্নাদা নাছোড়বান্দা, আমাকে তখনই গাড়িতে করে ক্লাবে নিয়ে যাবেন। শেষমেশ আমার জেদের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে হাত বাড়িয়ে বললেন- ‘আমার এই আংটি ছুঁয়ে বল তুই একটু পরেই ক্লাবে আসবি’। আমি তাই করলাম।


কি বলবো ভাই, জীবনে ওই একবারই মিথ্যে কথা বলেছি নিজের এবং মান্নাদার সম্মান রাখতে।


মান্নাদা চোখের আড়াল হতেই ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের মন্টু বোসকে ফোন করে পরিস্থিতি জানালাম। মন্টুদা বললেন তক্ষুনি ওঁর কাছে চলে আসতে। কিছু জামাকাপড় নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি থেকে চম্পট দিলাম।


বাঙালনামা।। সেই রাতে মোহনবাগান আর যোগাযোগ করেনি?


সুকুমার সমাজপতি।। কি বলছ! ইস্টবেঙ্গলের রিক্রুটাররাও অবধি জানতেন না যে আমি মন্টুদার কাছে পালিয়ে এসেছি। সেদিন বাড়ির নিচের তলায় ইস্টবেঙ্গলের অফিসিয়ালরা আর ওপরে মোহনবাগানের লোক অনেক রাত অবধি আমার জন্যে বসেছিলেন। বাড়ির লোকের অবস্থা একবার কল্পনা করো! শেষমেষ অনেক রাতে জোড়হাতে সবাইকে বলা হলো মন্টুদাকে ফোন করে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছি।


পরের দিন সকালে, আমি যে ডেরায় ছিলাম সেখানে খবরের কাগজ খুলে দেখি সমস্ত কাগজে হেডলাইন – ‘সমাজপতি কিডন্যাপড’। আমার ডেরা ছিল ব্রডওয়ে হোটেলের খুব কাছাকাছি, যেখান থেকে ইস্ট আফ্রিকা টুরের জন্য মোহনবাগান প্লেয়ার-রা বাসে উঠছিলেন। আমি ছাদ থেকে সে দৃশ্য দেখছিলাম। কিন্তু, ক্লাবের হয়ে বিদেশ ভ্রমণের জন্যে কোনও আর্জ অনুভব করিনি তখন, ভেবেছিলাম, ফুটবল খেলতে বিদেশে গেলে, দেশের হয়েই যাব।


বাঙালনামা।। লাল-হ্লুদের জার্সি গায়ে আপনার প্রথম মরসুমের কিছু কথা বলুন-


সুকুমার সমাজপতি।। প্রথম ম্যাচ ছিল পুলিশ-এর সঙ্গে। আমার পাস থেকে গোল হয়েছিল। দ্বিতীয় ম্যাচ ছিল বিএনআর-এর সঙ্গে। নিজেদের পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে বল ধরে একে একে ওদের ৭ জনকে কাটিয়ে গোল করি। এখনও কলকাতা ময়দানের ইতিহাসের সেরা গোলগুলোর মধ্যে এই গোলটার কথা আলোচনা হয়। তা সেই বছর লিগে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের থেকে অনেক বেশি পয়েন্টে এগিয়ে ছিল। রিটার্ণ লিগে যখন দু’দল মুখোমুখি হচ্ছে, তখন জিতলেই আমরা লিগ জিতে যাবো, এমন একটা পরিস্থিতি ছিল। সে ম্যাচে আমার পাস থেকে বলরাম গোল করে ইস্টবেঙ্গলকে জেতান।


(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)


About these ads

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 54 other followers

%d bloggers like this: